প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে দুই দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে দলটির পক্ষ থেকে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এনসিপি উল্লেখ করেছে যে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একজনকে প্রকাশ্যে গণপিটুনি দেওয়া, পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় আবারও হামলা চালানো এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করা আইন শাসন ও নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত। কোনো অভিযোগের বিচার করার অধিকার কোনো গোষ্ঠীর নেই; বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আইনানুগ বিচারব্যবস্থার।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর দেবহাটায় শামীমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ সংবলিত একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে মারধর করা হলে ৯৯৯-এ পাওয়া খবরের ভিত্তিতে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু রাতের দিকে বিক্ষুব্ধ লোকজনের একটি দল হাসপাতালে প্রবেশ করে চিকিৎসাধীন শামীমের ওপর আবারও হামলা চালায়। পরে দ্বিতীয় দফার গণপিটুনিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, হামলার ঘটনায় কারী ফজলুল হক আমিনী সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় যুবদল কর্মী সাদিকুল ইসলাম এবং সরকারি খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাজমুল। পুলিশ ও হাসপাতালকর্মীদের বাধা সত্ত্বেও শামীমকে মারধর করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনসিপি বলেছে, প্রথম দফায় পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরও তাঁর জীবনের নিরাপত্তা পর্যাপ্তভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। হাসপাতাল যদি একজন আহত মানুষের জন্যও নিরাপদ আশ্রয় না থাকে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়—এ প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। শত শত মানুষের ভিড় কীভাবে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করে একজন চিকিৎসাধীন ব্যক্তির ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলার সুযোগ পেল, তা তদন্ত করতে হবে। শুধু তদন্তের ঘোষণা নয়, হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে দলটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ গুরুতর হলে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনানুগ বিচার হতে পারে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার আগেই শাস্তি দেওয়ার নামে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠার নামে আইন ভাঙা, হত্যা সংঘটিত করা কিংবা বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই।
এনসিপির ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড পবিত্র ইসলামের মৌলিক শিক্ষারও পরিপন্থী। সব প্রাণের নিরাপত্তা ও মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা এবং মানুষের জীবন ও আইনি অধিকার রক্ষা—দুটিই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচার করার অধিকার কারও নেই।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহত শামীমের পরিবারের দাবি, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং তাঁর চিকিৎসা চলছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া অডিওর সত্যতা, বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট এবং তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো অডিও বা অভিযোগকে হত্যাকাণ্ডের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—কোনো অবস্থাতেই গণপিটুনি দিয়ে হত্যা বৈধ হয়ে যায় না।
এ ঘটনায় এনসিপি চার দফা দাবি জানিয়েছে। প্রথমত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার হামলায় অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। হামলায় উসকানি দেওয়া, জনতাকে সংগঠিত করা কিংবা সহিংসতা সংঘটনে ভূমিকা রাখার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শামীমের ওপর হামলা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো এবং কারও দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
তৃতীয়ত, যে অডিওকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে, তার উৎস, সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য প্রচার, জনতাকে জড়ো করা কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক উসকানি ও প্রাণনাশের হুমকির মাধ্যমে সহিংসতা ছড়ানো ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
চতুর্থত, নিহতের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীরা যাতে ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই বক্তব্য দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারকে আইনি সহায়তা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার কার্যকর সুযোগ দিতে হবে।
বিবৃতিতে এনসিপি বলেছে, সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান হতে হবে দ্ব্যর্থহীন। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই উত্তেজিত জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ছেড়ে দিলে আইন ও বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন