প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
হাসপাতালের মেঝেতে শীতল পাটিতে শুয়ে আছেন গুরুতর অসুস্থ এক রোগী। তাঁর পাশের বেড থেকে অক্সিজেনের জন্য একটি নল টেনে আনা হয়েছে।
এটি কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের দৃশ্য। অথচ এই হাসপাতালেই রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট ও লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছিল। বিশাল এই অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও, সামান্য হিউমিডিফায়ার বোতল ও ফ্লোমিটারের অভাবে রোগীরা মানবেতর অবস্থায় রয়েছেন।
করোনাকালে ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ উদ্যোগে যখন এই সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু হয়, তখন সবার মাঝে স্বস্তির অনুভূতি ছিল। কিন্তু আজ সেই স্বস্তি চরম অব্যবস্থাপনার কারণে হারিয়ে গেছে। হাসপাতালের অন্তত ১০টি ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে করুণ পরিস্থিতি। জীবন বাঁচানোর জন্য রোগীদের অক্সিজেন পেতে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। কোথাও অন্য রোগীর বেডের নিচে বসে, আবার কোথাও মেঝেতে বিছানা পেতে অক্সিজেন নিচ্ছেন মুমূর্ষু রোগীরা। চার কোটি টাকার এই আয়োজন যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে কিছু ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের অভাবে। অক্সিজেন সরবরাহের বেশ কয়েকটি আউটারও দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে রয়েছে।
পুরুষ সার্জারি (১০ নম্বর) এবং মহিলা সার্জারি (৬ নম্বর) ওয়ার্ডের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। ১৮ শয্যার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে সচল হিউমিডিফায়ার ও ফ্লোমিটার আছে মাত্র দুটি। অন্যদিকে ২৮ শয্যার ১০ নম্বর ওয়ার্ডে মাত্র পাঁচটি সচল রয়েছে। ৩ নম্বর ওয়ার্ডেরও একই অবস্থা, যেখানে ২০টি বেডের মধ্যে অন্তত ছয়টি অক্সিজেন সংযোগ একেবারেই অচল। রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা এই সংকটের নির্মম শিকার। ভর্তি থাকা এক রোগীর স্বজন আব্বাসের কণ্ঠে অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে। রোগীর অবস্থা গুরুতর হলেও নির্দিষ্ট বেডে অক্সিজেনের ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে তাঁকে অক্সিজেন দিতে হয়েছে। পোড়াদহের কালীনাথপুর থেকে আসা মুক্তা ১৬ দিন ধরে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন।
তিনি জানালেন, রোগীকে প্রয়োজন হলে সচল ব্যবস্থা থাকা বেডে নিয়ে যেতে হয়, কখনো আবার একটি বেডের বোতল খুলে অন্য জায়গায় লাগিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালানো হয়। সদর উপজেলার আসাননগরের আব্দুর রাজ্জাকও জানালেন, বেড ফাঁকা থাকলেও সংযোগযুক্ত বেডে অক্সিজেনের বোতল নেই।
নার্স ও ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা প্রতিদিন এই সংকটের সঙ্গে লড়াই করছেন। ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইনচার্জ বিলকিস খাতুন এবং ১০ নম্বর ওয়ার্ডের নার্স রাবেয়া জানান, এত কম সচল যন্ত্র দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাধ্য হয়ে তাঁদের গুরুতর অসুস্থ রোগীদের অন্য বেডের পাশে বসিয়ে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। ওয়ার্ড সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্ল্যান্ট স্থাপনের পর থেকেই বিভিন্ন ওয়ার্ডের কয়েকটি আউটার নষ্ট হয়ে যায়। টেকনিশিয়ানরা এসে দেখে গেলেও সেগুলো সচল করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়া হিউমিডিফায়ার বোতল ও ফ্লোমিটারের জায়গায় নতুন সরঞ্জামও মাসের পর মাস সরবরাহ করা হয়নি।
চিকিৎসকরা বারবার সতর্ক করছেন, যাঁদের নিয়মিত বা উচ্চমাত্রায় অক্সিজেন প্রয়োজন, তাঁদের ক্ষেত্রে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তা বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এত বড় ঝুঁকির পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্লিপ্ততা বিস্ময়কর। কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলামের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তাঁকে এখনো কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।
তবে খোঁজখবর নিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। চার কোটি টাকার সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট যখন কয়েক শ টাকার যন্ত্রাংশের অভাবে অকেজো হয়ে মুমূর্ষু রোগীদের মেঝেতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করছে, তখন কর্তৃপক্ষের এমন 'খোঁজ নেওয়ার' অপেক্ষায় থাকা রোগীদের জন্য এক চরম ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন