প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ : হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর প্রথমবারের মতো আজ মঙ্গলবার ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ইসরাইলের নাগরিকরা। দেশটির ভোটাররা গভীরভাবে বিভক্ত এই নির্বাচনে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ও ইসরাইলের ক্রমশ ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করবেন।
সংবাদ সংস্থা এএফপি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর শুরু হওয়া একাধিক ফ্রন্টে আঞ্চলিক যুদ্ধের তিন বছর পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভোট দিতে যাচ্ছে ইসরাইলিরা। এই যুদ্ধের ক্ষত এখনও তাদের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। তাই নির্বাচনী প্রচারে হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি— এই দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া এই নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সামরিক অভিযান, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি নির্মাণের বিস্তার ও সহিংসতা এবং উগ্র ডানপন্থী ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের উত্থান দেশটির আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার প্রধান মধ্যপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের জনপ্রিয়তায় প্রায় সমান সমান লড়াই চলছে। সাবেক এই সেনাপ্রধান রাজনীতিতে নবীন।
ইসরাইলে প্রায় ৭৩ লাখ মানুষের ভোট দেওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচ লাখেরও বেশি তরুণ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। জরিপ অনুযায়ী, এসব তরুণের অধিকাংশই নিজেদের মধ্য-ডানপন্থী বা ডানপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী বলে মনে করেন।
ইসরাইলের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত এই নির্বাচনে ভোট দিতে বিদেশ থেকে কয়েক দশ হাজার ইসরাইলি দেশে ফিরেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগের দিন জেরুজালেমে এএফপিকে ৫৮ বছর বয়সী আবাসন ব্যবসায়ী উরিয়েল ব্র্যান্ডলার মন্তব্য করেন, ‘আমার মনে হয়, ইসরাইল রাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের ভালো পরিবর্তন প্রয়োজন।’ ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু বিরতি দিয়ে মোট ১৯ বছরেরও বেশি সময় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি নিজের নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে এনেছেন।
নেতানিয়াহুর দাবি, ইসরাইলিদের নিরাপদ রাখার সক্ষমতা একমাত্র তারই রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে একাধিক যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরাইল। এসব অভিযানে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রথমবারের মতো ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।
দেশের ভেতরেও ইসরাইলিরা ইরান, হামাস, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে পড়েছেন। ৮৫ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নারী জিপ্পোরাহ বেনেট জানান, তিনি নেতানিয়াহুকেই ভোট দেবেন। তার মতে, কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে দেশকে পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেতানিয়াহুর রয়েছে।
বেনেট বলেন, ‘মার্কিন সরকারের পূর্ণ সমর্থন তার রয়েছে। আর আমি বিশ্বাস করি, তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি পদক্ষেপ নিতে ভয় পান না।’ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন নেতানিয়াহু। সে সময় তিনি তার সরকারে উগ্র ডানপন্থী ও কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর থেকে ইসরাইলের রাজনীতিতে এসব দলের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সামরিক বাহিনীতে জনবলের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অতি-গোঁড়া ইহুদি ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় নেতানিয়াহুকে সমালোচনা করছে বিরোধীরা। এ ক্ষেত্রে তার সরকারের অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর ওপর নির্ভরশীলতাও বিরোধীদের সমালোচনার অন্যতম কারণ।
তবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার দায় তিনি স্বীকার করেননি। ওই হামলাটি ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন হিসেবে বিবেচিত। সাবেক সেনাপ্রধান ও ৬৬ বছর বয়সী বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ওই হামলার পেছনে থাকা নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করবেন। নেতানিয়াহুর সরকার এখন পর্যন্ত এ ধরনের তদন্তের উদ্যোগ নিতে অনীহা দেখিয়েছে।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে আইজেনকোটের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একটি অনানুষ্ঠানিক জোট গড়ে উঠেছে। তার দল ‘ইয়াশার’-এর নেতৃত্বে থাকা এই জোটে ডানপন্থী থেকে মধ্য-বামপন্থী বিভিন্ন মতাদর্শের দল রয়েছে। আইজেনকোট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন এবং ইসরাইলি বসতি স্থাপনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সহিংসতায় জড়িত ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট— কেউই প্রকাশ্যে প্রধানত আরব ভোটারদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের জোটে যাওয়ার ঘোষণা দেননি। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ আরব। নির্বাচনে প্রত্যাশিত ব্যবধানে ফলাফল হলে এসব দল সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসরইলের ১২০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৬১টি আসন। নির্বাচনে কোনো একক দলই এই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে না। চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। এরপর সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা করতে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে।
দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবারও নতুন নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন