প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলি ঘোষ দস্তিদার।
পশ্চিমবঙ্গে একটানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনি ফল প্রকাশের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে পূর্বাভাস করলেও এত দ্রুত এই ধরনের বিপর্যয় ঘটবে, তা কেউই ধারণা করতে পারেননি। ২৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে থাকা এই দলটি মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে তিন টুকরো হয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে দলটির বেশির ভাগ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আলাদা ব্লক গঠন করে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করছেন। তারা কলকাতায় রাজ্য বিধানসভায় মূল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছেন।
অন্যদিকে, দিল্লিতে তৃণমূলের অন্তত ২০ জন লোকসভা এমপি স্পিকারকে একটি চিঠি দিয়ে পুরোনো দল ছাড়া হওয়ার ঘোষণা করেছেন। তারা ‘এনসিপিআই’ নামের একটি দলে যোগ দিয়ে কেন্দ্রে শাসক জোট এনডিএকে সমর্থন করছেন।
আর মূল দলটি কাগজে-কলমে মমতা ও তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা এখন ‘কালীঘাট তৃণমূল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস অতি দ্রুত ভেঙে যাওয়ার পেছনে মূল তিনটি কারণ নিচে ব্যাখ্যা করা হলো।
১. নির্বাচন-সর্বস্ব ও আদর্শহীন রাজনীতি
তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন আলোচনায় দেখা যায়, তাদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক দর্শন বা মতাদর্শ ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি মূলত জনমোহিনী নীতি বা ‘পপুলিজম’-এর ওপর ভিত্তি করে চলেছিল। ১৯৯৮ সালে দল গঠনের পর থেকে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসা পর্যন্ত তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সিপিআইএমকে হঠানো। ফলে, শুধু নির্বাচন জেতার উপরই তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল, যা দলটির জন্য চড়া মূল্য ডেকে এনেছে।
৪ মে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর, দলটির নেতারা বুঝতে পারেন যে ভোটে হারার পর তাদের আঁকড়ে ধরার মতো কোনো আদর্শিক ভিত্তি নেই। ভারতে কংগ্রেস, বিজেপি বা বামপন্থিদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ ও সংগঠন থাকায় তারা ভোটে হারলেও টিকে থাকে। এমনকি বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী যখন নিষিদ্ধ ছিল, তখনো তারা আদর্শগত ভিত্তি দিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। ফলে, ৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচনি কেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে দলটিকে বিস্তৃত করতে না পারায় এটি সহজে ভেঙে গেছে।
২. ক্যাটালিস্টের ভূমিকায় বিজেপি
নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্বলতম মুহূর্তে বিজেপি তাকে আঘাত করার কোনো সুযোগ ছাড়েনি। এই দল ভাঙার পেছনে বিজেপির সক্রিয় মদত ছিল। বিদ্রোহী বিধায়কদের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ভাঙার আগে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন এবং বিদ্রোহী এমপিরা বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বৈঠক করেন। পুরো বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আড়াল থেকে তদারক করেছেন বলে জানা গেছে।
বিজেপি চেয়েছে রাজপথের আন্দোলনকারী মমতার বদলে পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বিরোধী দল আসুক, যারা শুধু গঠনমূলক সমালোচনা করবে।
অন্যদিকে, দিল্লিতে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৪০ আসন) না পাওয়ায় শরিকদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ এমপিকে ভাঙিয়ে এনডিএর শক্তি ৩০০ পার করাই ছিল বিজেপির লক্ষ্য। তবে বিজেপি বিদ্রোহীদের নিজেদের দলে সরাসরি ঠাঁই দেয়নি।
৩. অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফ্যাক্টর
তৃণমূলের বিদ্রোহী নেতারা প্রায় প্রত্যেকেই দলের ভেতর দমবন্ধ পরিস্থিতির জন্য মমতার ভাইপো এবং অঘোষিত উত্তরাধিকারী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দায়ী করেছেন। অভিষেক ‘কর্পোরেট কায়দায়’ দল পরিচালনা করতেন এবং নিজস্ব একটি ঘনিষ্ঠ বলয় তৈরি করে রাখতেন। এর ফলে তৃণমূলের নিচুতলার সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের বড় দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়।
অভিষেক দলের ভেতর করপোরেট শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে আমজনতার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছেন। কয়েক বছর আগে তিনি ‘আই-প্যাক’ নামের একটি নির্বাচনী পরামর্শদাতা সংস্থাকে যুক্ত করেন। আই-প্যাকের বেতনভুক কর্মীরা কার্যত দলটিকে হাইজ্যাক করে নিয়েছিল এবং কে টিকিট পাবেন বা কে কী ভাষণ দেবেন, তা তাদেরই ঠিক করতে দেওয়া হয়েছিল। এর পাশাপাশি অভিষেকের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির নানা অভিযোগ দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। ক্ষুব্ধ নেতারা এখন তার দিকে আঙুল তোলে নিজেদের দলবদলকে জাস্টিফাই বা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন