প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ডিসি কমিক্সের একটি জাতির নাম এমাজনিয়া। এই জাতি সম্পূর্ণরূপে নারীদের দ্বারা গঠিত। দেবতাদের বর favor তাদের জন্ম এবং বড় হওয়া হয়, তাই তাদের জন্ম ও সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য পুরুষের প্রয়োজন হয় না। তারা নিজেদের দেশে পুরুষের অনুপ্রবেশ মেনে নেয় না। তাদের অভিযোগ, পুরুষরা ধ্বংসাত্মক এবং ঘৃণাজীবী।
এটি রূপকথার গল্পের মতো মনে হলেও বাস্তবে নারীরা পুরুষের দ্বারা সহিংসতা ও হেনস্থার শিকার হন। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা অন্যায়ের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের দোষারোপের প্রবণতা বাড়ছে। সম্প্রতি কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া ১৫ বছরের কিশোরীর লাশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন মন্তব্য ও বিদ্রূপ দেখা গেছে।
তবে অপরাধের শিকার হওয়ার পর নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের বিরুদ্ধে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ প্রতিবাদ গড়ে তুলেছে।
গ্রুপটির কার্যক্রম ও লক্ষ্য
প্রায় এক বছর আগে ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর এই গ্রুপটি যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ৩৬ হাজারের বেশি। গ্রুপটিতে মূলত সামাজিক মাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করা ব্যক্তিদের ছবি, পরিচয় এবং ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করা হয়।
গ্রুপটির প্রতিষ্ঠাতা লেখক আবির আহম্মেদ পিয়াস। তার সঙ্গে মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উম্মে সুরাইয়া সুমি ও জাকিয়া হোসেন। প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াসের মতে, অনলাইনে মন্তব্য করার সময় মানুষ নিজেদের সাজিয়ে গুছিয়ে রাখেন। তাদের আসল রূপ প্রকাশ করতে এবং অনলাইনে যা ইচ্ছা বলে যেন কেউ পার না পায়—এই লক্ষ্যেই তারা কাজ করছেন। অনলাইনে করা মন্তব্য বাস্তব সমাজের আচরণের অংশ এবং এর জন্য জবাবদিহি থাকতে হবে, সেটাই গ্রুপটির মূল বার্তা।
যেভাবে শুরু গ্রুপটি
হবিগঞ্জের একটি কনসার্টে নারীদের সঙ্গে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে হবিগঞ্জের জালাল স্টেডিয়ামে ওই কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছিল। এক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। কনসার্টে উপস্থিত নারীদের যৌন হয়রানি ও হেনস্থার শিকার হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সেই খবরের মন্তব্য সেকশনে এক নারীর শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার ঘটনা কদর্য ভাষায় বর্ণনা করে মন্তব্য করা হয়। মন্তব্যটিতে প্রচুর ‘হা হা’ প্রতিক্রিয়া আসে।
ঘটনাটি দেখে নো মোর সাইলেন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতারা ক্ষুব্ধ হন। তারা মনে করেন, এভাবে নারীদের হেনস্থা করে অনলাইনে গর্ব করা কিংবা হাসাহাসি করারও জবাবদিহিতা থাকা উচিত। এরপরই তারা গ্রুপটি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
পরিচয় প্রকাশের ফল
ওই ফেসবুক আইডির পরিচয় প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ফেসবুক আইডিটি থেকে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করা হয়, মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়ার পর আইডি হ্যাক করে অন্য কেউ ওই মন্তব্য করেছেন। এ জন্য ক্ষমাও চান তিনি। হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও কনসার্টের আয়োজকদের কাছে আলাদাভাবে ঘটনার অবহিতপত্র ও অঙ্গীকারনামা দেওয়ার কথাও জানান আইডির ব্যবহারকারী।
তবে গ্রুপটি পরিচয় প্রকাশের পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি বিদেশে তাদের কর্মক্ষেত্রের দূতাবাসেও মন্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে অভিযোগ জানায়। এই জাতীয় সক্রিয়তার ফলে বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। যেমন—কুমিল্লার নিহত কিশোরীকে নিয়ে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন যশোর মেডিক্যাল কলেজের এক শিক্ষার্থী। তার মন্তব্যের স্ক্রিনশট কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলে তিনি প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। কলেজ কর্তৃপক্ষ সেই ছাত্রকে ভবিষ্যতে এমন কাজ করলে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেয়।
আরেকটি ঘটনায়, এক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তির অশালীন মন্তব্যের স্ক্রিনশট তার অফিসে পাঠানো হলে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়। সাইপ্রাসে কর্মরত এক প্রবাসীও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার পর সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দূতাবাসের কাছে তথ্য পাঠানো হয়। চাপের মুখে অনেকেই ক্ষমা চেয়েছেন বা তাদের অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছেন।
ভুল তথ্যের ঝুঁকি ও সতর্কতা
মহৎ এই সামাজিক উদ্যোগের কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। তথ্য যাচাই না করে পরিচয় প্রকাশ করলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। কুমিল্লার নিহত কিশোরীর মায়ের বক্তব্য নিয়ে করা এক সংবাদের পোস্টে এক ব্যক্তি অশালীন মন্তব্য করেন এবং নিজেকে একটি ব্র্যান্ডের শোরুমের কর্মী বলে পরিচয় দেন। কিন্তু গ্রুপে তার নাম পরিচয় প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড কর্তৃপক্ষ বিবৃতি দিয়ে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই। যেহেতু অনলাইনে সবাই নিজের বিষয়ে সঠিক তথ্য দেন না, বিশেষ করে অপরাধীদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আইডি চালানোর প্রবণতা রয়েছে, তাই এসব ক্ষেত্রে সতর্ক না হলে ভুল তথ্য থেকে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে।
আইন কী বলছে?
নারীদের প্রতি অশালীন মন্তব্য ও ডিজিটাল হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী নারীর শালীনতা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে অপমান করলে এক বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আবার সাইবার সুরক্ষা আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে যৌন হয়রানি বা ভীতিপ্রদ উপাদান প্রকাশের অপরাধে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।
গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতাদের বার্তা
গ্রুপের মূল উদ্যোক্তা লেখক আবির আহম্মেদ পিয়াসের মতে, তারা যা করছেন সেই কাজগুলো করার জন্য দায়িত্ববান কর্তৃপক্ষ আছেন, যাদের উদাসীনতার জন্যই No More Silence এর মতো গ্রুপের জন্ম। যেদিন থেকে কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায়িত্ব গুরুত্ব দিয়ে পালন করবে, সেদিন থেকে হয়তো আর No More Silence গ্রুপেরও প্রয়োজন হবে না।
কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন আবির আহম্মেদ পিয়াস। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন। পাঠকদের জন্য তার এই সাক্ষাৎকার তুলে দেওয়া হলো :
কালের কণ্ঠ : কেন আর কীভাবে এই গ্রুপ তৈরির চিন্তা মাথায় আসলো?
আবির : আমি দেখতাম ফেসবুকে প্রচুর কমেন্ট মানুষকে অপমান বা হাস্যরস করার উদ্দেশ্যে করা হয়। অথচ যিনি এই কমেন্টগুলো করেছেন, তিনি নিজের প্রোফাইলটা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখেন। মনে হয় যেন তারা একটা বাবলের ভেতরে থাকেন, আর বাবলের বাইরে তাদের আরেক রূপ দেখিয়ে বেড়ান। তাদের এমন স্বভাব সবার সামনে নিয়ে আসার জন্য আমি আমার প্রোফাইলে এক্সপোজ পোস্ট দেওয়া শুরু করি। পরে আমার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী বলেন, কাজটা একটা পেজ কিংবা গ্রুপের মাধ্যমে চালিয়ে যেতে। পরবর্তীতে সেটাই করি, আর No More Silence এর শুরু হয়।
কালের কণ্ঠ : যেহেতু এই জাতীয় কাজের ফলে অনলাইনে অনেক বিরোধিতা ও শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সেক্ষেত্রে সেটা কীভাবে সামলানোর কথা ভেবেছেন?
আবির : সম্ভাবনা আছেই, ইতোমধ্যে আমরা অনলাইনে সেগুলো ফেসও করেছি। আমাদের ফিমেল মডারেটরদের রেপ থ্রেট, কিডন্যাপ করার মতো হুমকি, গ্রুপ উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, আমাকে দেখে নেওয়ার মতো ম্যাসেজও পেয়েছি, স্বয়ং যাদের এক্সপোজ করেছি তাদের কাছ থেকেই। আপাতত কোনও আক্রমণ এলে আমাদের যতটুকু এবিলিটি আছে, তা নিয়েই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতাটা আছে।
কালের কণ্ঠ : এভাবে মানুষের পরিচয় প্রকাশ করাটা কি আইন বহির্ভূত হচ্ছে? কিংবা এভাবে মানুষের পরিচয় প্রকাশ করে তাদের মবের মুখোমুখি করার সম্ভাবনা আছে কিনা বা তারা ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে কিনা?
আবির : আইনত অনেক কিছুই আমরা করতে পারি না। এইজন্য আমরা শুধুমাত্র সেই তথ্যই শেয়ার করি যেগুলো পাবলিক ডোমেইনে এভেইলেবল। কারও আইডি ট্র্যাক করা, তার ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে সেটা পাবলিক করা, এগুলো আমাদের কর্মকাণ্ডে পড়ে না। তবে হ্যাঁ, এই কাজগুলো করার জন্য অথোরিটি আছে, তাদের উদাসীনতার জন্যই No More Silence এর মতো গ্রুপের জন্ম। যেদিন থেকে কর্তৃপক্ষ এইসব কাজ গুরুত্ব সহকারে করা শুরু করবে, No More Silence এর কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও হবে না।
কালের কণ্ঠ : আপনাদের এই টিমে কি আইন, সাইবার এক্সপার্ট ইত্যাদি সব রকম বিশেষজ্ঞ আছেন?
আবির: কিছু ভলান্টিয়ার রয়েছেন যারা মাঝেমধ্যেই আমাদের নানারকম কাজে সাহায্য করে থাকেন। তবে তাদের গ্রুপের মূল সদস্য বলা যাবে না।
কালের কণ্ঠ : যাদের পরিচয় প্রকাশ করবেন তাদের কীভাবে নির্বাচিত করেন ও কীভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেন?
আবির : প্রথমত আমরা সেসব পোস্ট চেক করি যার কমেন্ট সেকশন এলার্মিং। এরপর সেই পোস্টের কমেন্ট সেকশন থেকে সবচেয়ে আপত্তিকর কমেন্টগুলো সিলেক্ট করে, আইডিগুলো চেক করে আমরা দেখি যে কোন কোন আইডি আসল। সেগুলো বাছাই হলে আমরা তথ্য সংগ্রহ শুরু করি। পরে পোস্টের ফরম্যাট তৈরি করি।
কালের কণ্ঠ : আসলেই এই উদ্যোগের ফলে অনলাইনে কোনো প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয়? যাদের পরিচয় প্রকাশ করেছেন তারা কি মাফ চান নাকি আরও বেশি আক্রমণ করেন? আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?
আবির : দুটোই হয়েছে। আর হ্যাঁ, অনলাইন জগতে এই রেপুটেশন তৈরি হয়েছে যে একটা গ্রুপ অনলাইনে নজরদারি করছে। এজন্য যত্রতত্র একটা অপমানজনক, অশ্লীল কমেন্ট করা থেকে অনেকে বিরত থাকছেন। সামনে এইটা আরও বাড়বে।
কালের কণ্ঠ : সাধারণত দেখা যায় ফেসবুকে বা অনলাইনে যেকোনো কমিউনিটি জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর অনেক নিজস্ব স্বার্থ ও এজেন্ডাভিত্তিক কাজে জড়িয়ে যায়। আপনাদের এক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য কি ভিন্ন কিছু?
আবির : ২০২৫ এর নভেম্বরের ২ তারিখে যেই টার্গেট নিয়ে এই গ্রুপ খোলা হয়েছে, সেই টার্গেটের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা আমাদের নেই। তবে হ্যাঁ, কিছু কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে, যেগুলো করতে হলে সরকারের অনুমতি এবং সাহায্য, দুটোই দরকার। তবে এখনও ওই পথে যাওয়ার প্ল্যান হয়নি।
কালের কণ্ঠ : এই কাজ করার জন্য আপনাদের কি কোনো ফান্ড দেওয়া হয়? বা কেউ কি আপনাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন? না করে থাকলে আপনাদের ভবিষ্যতে কি এতে আগ্রহ বা প্রয়োজন আছে?
আবির : আমাদের এই গ্রুপের জন্য কোনও ফান্ড বা ডোনেশন কালেক্ট করা হয় না। পুরোটাই নন-প্রফিট ওয়ার্ক। তবে এইজন্যই আবার আমাদের মডারেটর পেতে সমস্যা হয়। এতদিনেও আমরা ফ্রিতে কাজ করবে এমন কিছু মডারেটর খুঁজে বের করতে পারিনি। তবে গ্রুপ বড় হলে আমাদের ইচ্ছা আছে একটা ডাটাবেজ তৈরির কাজে হাত দেওয়ার, যার জন্য সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের সাথে জড়াতে হবে আমাদের। তখন হয়তো আমাদের ডোনেশনের কিংবা পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সেটা অনেক দূরের পরিকল্পনা।
কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।
আবির : আপনাকেও ধন্যবাদ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন