প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এবার ইলিশের ভরা মৌসুমেও পদ্মা-যমুনা নদীতে কাঙ্খিত ইলিশের দেখা মিলছে না। নদীতে জাল ফেলে হতাশ হয়ে ফিরছেন জেলেরা। দাদনের বেড়া জালে চিন্তিত দরিদ্র জেলেরা। ভাদ্র-আশ্বিন এই দুই মাস ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে পরিচিত। এ সময় জেলের জালে ঝাকে ঝাকে চকচকে রূপালী ইলিশ ধরা পড়ার কথা। মাছের আড়তগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় সরগরম হয়ে উঠার কথা ছিল।
কিন্তু এ বছর আরিচা ঘাটের যমুনা নদীর তীরে মাছের আড়তে ইলিশের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। স্থানীয় বাজারগুলোতেও ইলিশের চরম সংকট চলছে এবং দামও অনেক চড়া। যা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। কাঙ্খিত ইলিশ না পাওয়ায় জেলেরা দিন-রাত নদী চষে বেড়ালেও তাদের জ্বালানি খরচ উঠছে না। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তারা। পদ্মা-যমুনার তীরবর্তী মাছের আড়তগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন আরিচা ঘাটের আড়তদার ও পদ্মা-যমুনা মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত জেলেরা।
ইলিশের এমন সংকটের পেছনে মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, নদী ভরাট হয়ে গভীরতা কমে যাওয়া, নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে নির্বিচারে মাছ ধরা, নদীর তলদেশে খাদ্য সংকট এবং নদীর পানি দূষণসহ অন্যান্য কারণে ইলিশের সংকট দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বর্ষাকাল চলছে। পদ্মা-যমুনায় পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। নদীতে মাছ শিকারি জেলে নৌকার আনাগোনা রয়েছে। কিন্তু এ দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘশ্বাস এবং হতাশার কালো মেঘ। কারণ ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে কাঙ্খিত চকচকে রূপালী ইলিশ উঠছে না। দিন-রাত নদীতে জাল ফেলে ইলিশের দেখা মিলছে না। এতে জেলেদের জ্বালানি খরচসহ খোরাকিই উঠছে না। হতাশায় হাবু-ডুবু খাচ্ছেন ঋণগ্রস্থ্য জেলেরা।
এদিকে মৌসুমের শুরুতেই মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়েছিলেন যেসব জেলেরা, তাদের ঋণের বোঝা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এ প্রতিনিধিকে এমন তথ্যই জানিয়েছেন শিবালয় উপজেলার পদ্মা-যমুনায় মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত জেলেরা।
শুক্রবার সকালে আরিচা ঘাটের আড়তে গিয়ে দেখা গেছে, পদ্মা-যমুনার অল্প কিছু মাছ উঠেছে। কাক ডাকা ভোরে জেলেদের নৌকা তীরে এসে ভীড়া দেখে আড়তদাররা আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু নদীতে টানা ১০-১২ ঘণ্টা জাল ফেলে দু’/একজন ১/২টি ইলিশ মাছ নিয়ে আসেন। বাকীরা কেউ শূন্য হাতে ফিরেন, না হয় অন্য মাছ নিয়ে আসেন। একটি জেলে নৌকায় ৩ থেকে ৫ জনের একটি টিম থাকে। এতে অনেক খরচ হয়। এর মধ্যে জ্বালানিসহ অন্যান্য খরচ তুলতে জেলেরা আড়তে এনে ইলিশ মাছের চড়া দাম হাঁকেন। চড়া দামে মাছ ক্রয়ের পরে পাইকাররাও চড়া দামে কিনে নিয়ে আবার চড়াদামেই বিক্রি করেন সাধারণ মানুষের কাছে।
আরিচা ঘাটের আড়ৎদারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গতবছর ১ কেজি ইলিশের দাম ছিল ১ হাজার টাকা। বর্তমানে সেই একই ইলিশের দাম ২৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছুদিন আগে পদ্মা-যমুনার প্রতি কেজি ইলিশ ৩৮শ’ থেকে ৪হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
শিবালয় উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, শিবালয়ের জাফরগঞ্জ পাল পাড়া থেকে বাল্লা মালুচি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের বিশেষ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্ষার এ সময় শিবালয় উপজেলার পদ্মা-যমুনার উক্ত এলাকাজুড়ে ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। উপজেলায় নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলে রয়েছে ৪ হাজার ২শ’ জন এবং এর বাইরেও আরো অনেক জেলে রয়েছে। শিবালয়ে পর্যাপ্ত মাছের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন অনেক কম। গত ২০২৪ -২০২৫ অর্থ বছরে শিবালয় উপজেলায় ৪শ’ ৯৯ মেট্রিন টন ইলিশ মাছ উৎপাদন হয়েছে। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বছরে দুইবার জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়ে থাকে। গত অর্থবছরে মা ইলিশ সংরক্ষণের সময় ২ হাজার ১শ ১৪ জন জেলে পরিবারকে মাসে ২৫ কেজি করে দুই মাসের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ঝাটকা সংরক্ষণের সময় ৬শ’ ৫০জন জেলে পরিবারকে প্রতি পরিবারকে ৮০কেজি করে খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। এছাড়া, এসব জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে প্রকল্পের মাধ্যমে গরু, বাছুরসহ বিভিন্ন ধরনের উপকরণ দেওয়া হয়েছে। এ বছর ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার পিছনে প্রয়োজনের তুলনায় নদীর নাব্যতা কম, পানি দূষণ, অবৈধ জাল ব্যবহার, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং জলবায়ু পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য কারণ। নদীর নাব্যতা সংকট এবং ইলিশের খাদ্যের অভাবও মাছের উপর প্রভাব ফেলছে।
শিবালয় উপজেলার আরিচা ঘাট এলাকার আড়তদার হাজী মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ইলিশ গভীর পানির মাছ। স্রোতের বিপরীতে এরা চলে। নদীতে নাব্যতা সংকটের কারণে পদ্মা-যমুনায় দিন দিন ইলিশের বিচরণ কমে যাচ্ছে। ইলিশ শূন্য হয়ে পড়ছে পদ্মা-যমুনা। এতে অনেক আড়তদারদেরও বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের আড়ত বন্ধ হয়ে গেছে আবার অনেক আড়ত বন্ধ হওয়ার পথে। এই আড়তে আগে অনেক বেচাকেনা হতো, সেই তুলনায় এখন বেচাকেনা নেই বললেই চলে। হঠাৎ এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে তা সবার কল্পনার বাইরে ছিল। জেলেদের জালে যেই ইলিশ ধরা পড়ছে, তা বিক্রি করে আড়তের ঋণ পরিশোধ করার সামর্থ্য তাদের নেই। নদীতে এমন ইলিশ শুন্য থাকলে অনেক পরিবারের পথে বসা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।
চৌহালির জেলে ইউসুফ আলী বলেন, আমরা নৌকায় ৬ জন জেলে মিলে নদীতে দিনরাত মাছ ধরি। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পরিশ্রম করে ইলিশ পাই ২ থেকে ৩ হাজার টাকার, কিন্তু আমাদের খরচ হয় তার থেকে অনেক বেশি। গত বছরের তুলনায় এই বছর নদীতে ইলিশ নেই বললেই চলে। গতবার নদীতে এক খেও দিলেই ১০-১২ হাজার টাকার ইলিশ পেতাম। এবছর তিন খেও দিলেও ১০ হাজার টাকার ইলিশ পাই না। দুই তিন বছর আগেও ইলিশের এ মৌসুমে ৩-৪ লাখ টাকা ইলিশ বিক্রি করতে পেরেছি, কিন্তু এবার প্রতিদিনের খরচ উঠানোই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আড়তদার থেকে হাজার হাজার টাকার দাদন নিয়ে নদীতে নেমেছি, এখন এই দাদনের টাকা কিভাবে পরিশোধ করব, এই চিন্তায় ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
আরিচা অঞ্চলের যমুনার জেলে অজিত হলদার বলেন, ভোর থেকে আমরা পাঁচজন জেলে এই দুপুর পর্যন্ত পরিশ্রম করে ছোট সাইজের ২টি ইলিশ পেয়েছি। বিক্রি করেছি ৪ হাজার টাকা। এতে আমাদের জ্বালানি খরচও ওঠেনি। বাড়িতে চাল-ডাল এখন কষ্ট করে কিনতে হয়। কীভাবে সামনে দিনে চলবে, তা ভাবলে ঘুম আসে না।
শিবালয় উপজেলার ছোটবোয়ালী গ্রামের জেলে প্রেমো হলদার বলেন, গতবছর দুই মাসে প্রতি নৌকায় ৩-৪ লাখ টাকা করে কামাই হয়েছিল। সেই তুলনায় এবছর নদীতে ইলিশ মাছ একবারেই নেই। এজন্যই আমাদের জেলেদের না খেয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। কিন্তু আমরা রাত দিন ২৪ ঘণ্টা নদীতে মাছ ধরে সকালে আড়তে এসে মাছ বিক্রি করি ৩-৪ হাজার টাকা। এইজন্য অনেক জেলে মাছ ধরতে আসে না, অন্য কাজে চলে যাচ্ছে। এবছর দাদনের টাকাও পরিশোধ করতে পারবো না। ইঞ্জিন এবং নৌকার খরচ উঠানোই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, ইলিশ আসলে সমুদ্রের গভীর পানির মাছ। ইলিশ এই বর্ষা মৌসুমে ডিম ছাড়ার জন্য পদ্মা-যমুনায় আসে। কিন্তু ফারাক্কা বাধের কারণে নদীতে নাব্যতা সংকটে নদীর গভীরতা কমে গেছে। এছাড়া নদীতে অপরিকল্পিত ড্রেজিং এবং নদীতে অসংখ্য ডুবোচর আছে। এতে নাব্যতা একেবারেই কমে গিয়ে গতিপথ দিন দিন পরিবর্তন হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের একটি ব্যাপার আছে। এছাড়া নদী দূষণ, পলিশন, কারেন্ট জাল দিয়ে অবৈধভাবে মাছ ধরা এবং নিষেধাজ্ঞার সময় অসাধু জেলেদের মাছ ধরাসহ নানাবিধ কারণে ইলিশ মাছ কমে যাচ্ছে। তবে এখনও যে সময় আছে, তাতে ইলিশ নদীতে আসবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন