প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শনিবার শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত একটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য চেন্নাইয়ে পৌঁছেছেন ভারতের লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে তার জন্য একটি আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল—তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি. জোসেফ বিজয়ের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চেন্নাই বিমানবন্দরে পৌঁছান রাহুল। এরপর তিনি বিজয়ের নীলাঙ্কারাইয়ের বাসভবনে যান। দুপুর দেড়টায় দুই নেতার মধ্যাহ্নভোজে বসার কথা ছিল। বিকালে আইল্যান্ড গ্রাউন্ডসে ‘মানাভারগালিন কুরাল’ বা ‘শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন রাহুল। পরীক্ষার চাপ, শিক্ষার ব্যয়, বেকারত্বসহ তরুণদের নানা সমস্যা নিয়ে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
দিল্লিতে যখন বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় চলছে, তখন শনিবারের বড় একটি অংশ চেন্নাইয়ে কাটানোর সিদ্ধান্ত রাহুলের সফরকে বাড়তি রাজনৈতিক তাৎপর্য দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর তামিলনাড়ুতে এটি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপস্থিতি। একসময় জাতীয় পর্যায়ে কংগ্রেসের বিরোধী রাজনীতির কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা এই রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে রাহুলের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তামিলনাড়ু ও পুদুচেরির মোট ৪০টি আসনে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হয়েছে। তামিলনাড়ুতে কংগ্রেসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নয়টি আসনে দলটি জয় পেয়েছিল। কিন্তু এই সাফল্যের পরও কংগ্রেস কর্মীদের ধন্যবাদ জানাতে রাজনৈতিক সফরে রাজ্যটিতে ফেরেননি রাহুল। তার সীমিত উপস্থিতি নিয়ে রাজ্য কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি দীর্ঘদিনের অংশীদার ডিএমকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সময়ও প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সমাপ্তি দেখা যায়নি।
এরপর তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর ডিএমকের জোট ছেড়ে বিজয়ের সরকারে যোগ দেয় কংগ্রেস। তামিলনাড়ু কংগ্রেসের সভাপতি কে. সেলভাপেরুন্থাগাইয়ের মেয়াদে দলটি ডিএমকের সঙ্গে থাকবে, নাকি বিকল্প পথ বেছে নেবে—এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলছিল। পরে তাকে সরিয়ে সভাপতি করা হয় মাণিকম ঠাকুরকে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাহুলের ঘনিষ্ঠ এবং বিজয়ের নেতৃত্বাধীন বিকল্প রাজনৈতিক পথের সমর্থক।
তবে বিজয়ের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজনটি প্রথম থেকেই নিশ্চিত ছিল না। দিল্লিতে চলতি সপ্তাহে বিক্ষোভের সময় রাহুলকে একাধিকবার আটক করা হলেও বিজয় প্রকাশ্যে এর নিন্দা জানাননি। এতে কংগ্রেস নেতার ঘনিষ্ঠ মহলে প্রশ্ন ওঠে, যে মুখ্যমন্ত্রীর শিবির তাকে স্বাগত জানানো নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে, তার সঙ্গে দেখা করতে রাহুলের চেন্নাই যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত।
অন্যদিকে, বিজয়ের শিবিরেও এ বৈঠক নিয়ে সংশয় ছিল। একপর্যায়ে দুই পক্ষের অস্বস্তি প্রায় সমান হয়ে ওঠে। রাহুলের ঘনিষ্ঠরা ভাবছিলেন, বিজয় কেন তার সঙ্গে দেখা করতে অনীহা দেখাচ্ছেন। আর মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের প্রশ্ন ছিল, বৈঠকটিকে এমনভাবে দেখা হচ্ছে কেন, যেন রাহুলের সঙ্গে দেখা করা বিজয়ের বাধ্যবাধকতা। শেষ পর্যন্ত মধ্যাহ্নভোজের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় নতুন জোটের ভেতরে অবিশ্বাসের একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পর্বের অবসান ঘটে।
মোদির সঙ্গে একই মঞ্চে
বৈঠকের সময়সূচিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাহুলকে নিজ বাসভবনে আপ্যায়নের এক দিন পর, ১১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বিজয়ের। চেন্নাই মেট্রোর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম চালু হওয়া অংশের উদ্বোধন করবেন মোদি। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর এটিই হবে মোদি ও বিজয়ের প্রথম যৌথ জনসম্মুখ উপস্থিতি।
কর্মসূচিটি প্রশাসনিক। মোদি চেন্নাই মেট্রোর ১৪ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পুনামাল্লি-ভাদাপালানি অংশের উদ্বোধন করবেন। এরপর বিজয়কে সঙ্গে নিয়ে পুনামাল্লি থেকে পোরুরের দিকে মেট্রোতে যাত্রা করার কথা রয়েছে তার।
তবে এ কর্মসূচির রাজনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষা করা কঠিন। তামিলনাড়ুতে নিজেদের শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিজয়ের পাশে মেট্রোতে যাত্রা করা মোদির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য তৈরি করবে।
বিজয়ের জন্যও সময়ের এই বিন্যাস তাৎপর্যপূর্ণ। শনিবার জাতীয় বিরোধী রাজনীতির প্রধান নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ, আর রোববার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মেট্রোযাত্রা—সরকার পরিচালনার দায়িত্ব তাকে জাতীয় রাজনীতির দুই বিপরীত মেরুর নেতার পাশে নিয়ে আসছে।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে পরিবর্তনের গতি বোঝা যায় এই দুই কর্মসূচির মধ্য দিয়েই। বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন রাহুল। এরপর শনিবার বিজয়ের বাসভবনে তাদের মধ্যাহ্নভোজই হবে নতুন ‘ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়বিচার বিজয় জোট’ গঠনের পর দুই নেতার প্রথম বৈঠক। এর এক দিন আগে তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম বা টিভিকে মাদুরান্থাকাম ও ধরাপুরাম বিধানসভা উপনির্বাচন—দুটিতেই জয় পেয়েছে।
টিভিকের কয়েকটি অংশ থেকে বিজয়কে ২০২৯ সালের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার পর কংগ্রেস নেতারা প্রকাশ্যে সেই ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। মাণিকম ঠাকুরও আলাদাভাবে বলেছেন, কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে রাহুল গান্ধীই দলের পছন্দ।
এ কারণে বিজয়ের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ আরেকটি মঞ্চের বক্তৃতার চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। কংগ্রেস ও টিভিকেকে এমন একটি রাজনৈতিক সমঝোতা সামলাতে হচ্ছে, যেখানে তামিলনাড়ুতে জোটের অবিসংবাদিত নেতা বিজয়, অন্যদিকে ২০২৯ সালের জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের সম্ভাব্য মুখ রাহুল গান্ধী।
কংগ্রেস নেতাদের দাবি, রাজ্য পর্যায়ে টিভিকে বিরোধীদের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অংশ হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও দলটির অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
মধ্যাহ্নভোজের পর রাহুল যাবেন আইল্যান্ড গ্রাউন্ডসে। কংগ্রেসের দাবি, সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে এ কর্মসূচিতে যুক্ত হতে এক লাখ থেকে দেড় লাখ শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছেন। নিবন্ধিত শিক্ষার্থীরা কিউআর কোডের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে প্রবেশ করতে পারবেন।
পরে তাজ করমন্ডেল হোটেলে কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে রাহুলের। এরপর রাত সাড়ে ৯টার দিকে তার দিল্লির উদ্দেশে চেন্নাই ছাড়ার কথা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন