প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ : বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করার উদ্যোগে জোর দিতে চায় শ্রীলঙ্কা। তবে, এ ক্ষেত্রে দেশটি কিছু কারিগরি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী অনুরা করুণাথিলাকা।
এএফপির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, ‘কিছু ঘটনা আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও বাড়ানোর জন্য এগুলো সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে।’
তিনি আরও জানান, সরকারের নীতি হবে আগামী কয়েক বছরে যতটা সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা।
শ্রীলঙ্কা তার প্রয়োজনীয় সব তেল ও গ্যাস আমদানি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দেশটি বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে।
জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং চালু হয়েছে এবং গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে মূল্যস্ফীতি। ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা দেশটির অর্থনীতিতে এসব পরিস্থিতি নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিছু মাসে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটাতে সরকারের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগেই শ্রীলঙ্কা জ্বালানি খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।
২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে দেশের মোট বিদ্যুতের ৭০ শতাংশ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, যার মধ্যে জলবিদ্যুতের অবদান প্রায় ৪০ শতাংশ।
তবে, জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘সম্ভবত আমাদের ৭০ শতাংশেরও বেশি অর্জন করতে হবে।’
তবে, বায়ুশক্তি প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় মানুষের আপত্তি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় বায়ুশক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা প্রায় ৩০ গিগাওয়াট বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু, দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় মান্নার উপদ্বীপের বাসিন্দারা ২০২০ সাল থেকে চালু থাকা বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে।
তাদের দাবি, এসব টারবাইনের কারণে বন্যার প্রকোপ বাড়ছে, মাছ অন্যত্র চলে যাচ্ছে ও পরিযায়ী পাখিরা হুমকির মুখে পড়ছে।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, মান্নারের বাসিন্দাদের উদ্বেগের বিষয়টি সরকার বিবেচনায় নিয়েছে। ইতোমধ্যেই অনুমোদিত বা নির্মাণাধীন প্রকল্প ছাড়া সেখানে নতুন কোনো বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প নেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প অন্য এলাকায় গড়ে তোলা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।
করুণাথিলাকা বলেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা, জাতীয় গ্রিডের নিয়ন্ত্রণ এবং চাহিদা ও সরবরাহের ওঠানামা সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, আগামী বছর থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়াতে পাঁচটি বড় সঞ্চালন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে, শুধু সঞ্চালনব্যবস্থা সম্প্রসারণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সৌর প্যানেল স্থাপনের ফলে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেক সময় চাহিদার চেয়ে বেশি হয়ে যাচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে।
চলতি মাসে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে পুরো দ্বীপজুড়ে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হয়ে যাওয়ায় এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কখনো কখনো কিছু সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়। এ কারণে সরকার সৌরবিদ্যুৎকে উৎসাহিত করছে না— এমন ধারণা তৈরি হলেও তা সঠিক নয়।
২০২৯ সালের মধ্যে শ্রীলঙ্কার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এটি ৩৮৮ শতাংশ বেশি।
তবে, সৌরবিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের বর্তমান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার।
বর্তমান ব্যবস্থায় বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদকরা দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে রাতে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ বিনা মূল্যে ব্যবহার করতে পারেন। অথচ দিনের তুলনায় রাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যয় বেশি।
জ্বালানিমন্ত্রীর মতে, এই ব্যবস্থা আর্থিকভাবে টেকসই নয়। এর বাড়তি ব্যয় সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই ব্যয়ের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য। তাই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক ও ভোক্তা— উভয়ের জন্য ন্যায্য হবে, এমন একটি নতুন আর্থিক কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হবে।’
পাশাপাশি ব্যাটারির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।
জ্বালানিমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, কয়লা ও ন্যাফথার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করার মতো ব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো এখনো শ্রীলঙ্কার তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশে উন্নীত করতে পারব।’
আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে কয়লা ও ন্যাফথার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন