প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার দ্রুত বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করছে। হাসপাতালের টিকিট ও বিভিন্ন ফি পরিশোধ, স্কুলের বেতন এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন কেনাকাটা থেকে শুরু করে সড়ক ও সেতুর টোল পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর চালুর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মানুষের নিয়মিত সম্পৃক্ততার এসব ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন কমানোর চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, বাংলা কিউআর চালু হলে এসব খাতে লেনদেন সহজ ও দ্রুত হবে এবং নগদ অর্থ ও ভাংতির সমস্যাও হ্রাস পাবে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলা কিউআর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান আরিফ হোসেন খান।
জানা গেছে, ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলা কিউআরকে আরও সহজ, নিরাপদ ও ব্যয়সাশ্রয়ী পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী তিন মাসে একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে। ইতোমধ্যে বাংলা কিউআরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত জুনের তুলনায় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন গুণ এবং লেনদেনের অর্থমূল্য বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। বর্তমানে বাংলা কিউআর ব্যবহারকারী মার্চেন্টের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখে পৌঁছেছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতির প্রতিটি লেনদেনের একটি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট তৈরি করা। দেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে অর্থনীতির প্রকৃত আকার আরও বড় হবে। এ কারণে ডিজিটাল ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৫১০ বিলিয়ন ডলার। ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির লেনদেনগুলোও যদি হিসাবের আওতায় আনা যায়, তাহলে প্রকৃত অর্থনীতির আকার আরও বড় হতে পারে। এ ধরনের বড় অর্থনীতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশের বাজারকে আরও দৃশ্যমান করে তুলবে।
তিনি বলেন, বিদেশিরা কোনো দেশে বিনিয়োগের আগে সেখানে বাজার আছে কি না এবং বাজারের আকার কত- তা বিবেচনা করে। বাংলাদেশকে যদি এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এ দেশে বিনিয়োগে আরও আগ্রহী হবে। আর এ লক্ষ্য অর্জনে ডিজিটাল ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, দেশের বড় অঙ্কের লেনদেন সাধারণত ক্যাশলেস পদ্ধতিতে হয়ে থাকে। কিন্তু ছোট ছোট দৈনন্দিন লেনদেন এখনো মূলত নগদনির্ভর। মুদি দোকান, বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় অল্প অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে নগদ অর্থের ব্যবহার বেশি। এই ছোট লেনদেনগুলোকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় আনতে বাংলা কিউআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, নগদ লেনদেনে নানা ধরনের বিড়ম্বনা রয়েছে। বাজারে নিম্ন মূল্যমানের নোটের সংকট রয়েছে। অনেক সময় ক্রেতার কাছে ৫০ টাকার নোট থাকলেও ১০ বা ২০ টাকার ভাংতি পাওয়া যায় না। আবার পুরোনো ও মলিন নোট নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়। এসব কারণে লেনদেনে সময় লাগে, কখনো ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে বিরোধও তৈরি হয়। বাংলা কিউআরের মাধ্যমে এসব সমস্যা অনেকটাই দূর করা সম্ভব।
আরিফ হোসেন খান বলেন, গত ১ জুলাই থেকে সর্বস্তরে বাংলা কিউআর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা চালু করা হয়েছে। এরপর গত তিন মাস ধরে বাস্তবে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এখন সেসব বাধা দূর করতেই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলা কিউআর চালুর পর ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত জুলাই থেকে এ পর্যন্ত বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন প্রায় চার গুণ বেড়েছে। সর্বশেষ এক সপ্তাহে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ দৈনিক গড়ে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। একই সময়ে মার্চেন্টের সংখ্যাও প্রায় তিন গুণ বেড়ে বর্তমানে ৪০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তবে এখনো বাংলা কিউআর ব্যবহারে অন্যতম সমস্যা হিসেবে ফি বা চার্জের বিষয়টি রয়েছে বলে জানান তিনি।
আরিফ হোসেন খান বলেন, কোনো ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করার পর যদি তার প্রাপ্য অর্থের একটি অংশ কেটে রাখা হয়, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের লেনদেনে উৎসাহিত হবেন না। তাই ব্যবসায়ীদের জন্য বিষয়টি কীভাবে সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী করা যায়, সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে বিভিন্ন সমাধান বের করা হয়েছে।
বাংলা কিউআরের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর আন্তঃব্যবহারযোগ্যতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে কোনো মার্চেন্ট একটি নির্দিষ্ট মোবাইল আর্থিক সেবা বা ব্যাংকের কিউআর ব্যবহার করলে অন্য প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সেখানে পেমেন্ট করতে পারতেন না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো মার্চেন্ট বিকাশের কিউআর ব্যবহার করলে নগদের গ্রাহক সেখানে পেমেন্ট করতে পারতেন না। একইভাবে কোনো ব্যাংকের গ্রাহক অন্য প্রতিষ্ঠানের কিউআর থাকলে সমস্যায় পড়তেন।
কিন্তু বাংলা কিউআরের মাধ্যমে এই সমস্যা দূর হয়েছে বলে জানান তিনি। এখন একটি সার্বজনীন কিউআর ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা লেনদেন করতে পারবেন। ফলে সবাই একটি অভিন্ন ব্যবস্থার আওতায় চলে এসেছে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলা কিউআরকে জনপ্রিয় করার জন্য গভর্নরের নেতৃত্বে একটি স্টিয়ারিং কমিটি এবং ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে একটি কার্যকরী কমিটি কাজ করছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা যুক্ত রয়েছেন।
তিনি বলেন, শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা দিয়ে বাংলা কিউআরের ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো সম্ভব নয়। এ কারণে দেশের প্রায় ১৯টি জেলায় বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। বাংলা কিউআরে কী ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকলে এটি মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে এবং কী ধরনের খরচ হলে এটি সবার জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী হবে-এসব বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়েছে।
আগামীকাল ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআরকে আরও জনপ্রিয় করতে কয়েকটি পদক্ষেপ কার্যকর হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু পদক্ষেপ ১ নভেম্বর থেকে এবং আরও কিছু পদক্ষেপ নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বছরের শেষ নাগাদ বাস্তবায়ন করা হবে। এসব পদক্ষেপ চালু হলে আগামী তিন মাসে গত তিন মাসের তুলনায় আরও দ্রুত অগ্রগতি হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলা কিউআর ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। স্বাস্থ্য খাতে হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কেনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় ১০ টাকার টিকিট কিনতে ৫০ টাকার নোট দিলে ভাংতি পাওয়া যায় না। এতে লাইনে অপেক্ষার সময় বাড়ে। বাংলা কিউআর থাকলে মোবাইল ফোন দিয়ে স্ক্যান করে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করা যাবে।
শিক্ষা খাতেও বাংলা কিউআর ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, স্কুলের বেতন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের ক্যান্টিনে খাবার কেনা, স্টেশনারি, পেন্সিল, ইরেজার, শার্পনার বা জ্যামিতি বক্স কেনার মতো ছোট লেনদেনও বাংলা কিউআরের মাধ্যমে করা সম্ভব। ইতোমধ্যে বেসরকারি স্কুলের বেতন ক্যাশলেস করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব পেমেন্ট বাংলা কিউআরের মাধ্যমে করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
যোগাযোগ খাতেও বাংলা কিউআর ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন সড়কের টোল প্লাজায় দীর্ঘ লাইনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, টোল পরিশোধের ক্ষেত্রেও কিউআর ব্যবহার করা গেলে সময় কমানো সম্ভব। এতে নগদ অর্থের প্রয়োজন হবে না এবং টোল আদায়ের প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক বলেন, যেসব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি, সেসব খাতে দ্রুত ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বাংলা কিউআরের উপযোগিতা, এর সুবিধা এবং বাস্তবায়নের বিষয়গুলো তাদের জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলা কিউআর বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নির্দেশনাও প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো তাদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিলে বাস্তবায়ন আরও দ্রুত হবে।
আরিফ হোসেন খান বলেন, বাংলা কিউআরকে শুধু একটি পেমেন্ট পদ্ধতি হিসেবে নয়, দেশের ক্যাশলেস অর্থনীতির অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী তিন মাসে নতুন পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলা কিউআরের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হবে এবং দৈনন্দিন ছোট লেনদেনের বড় একটি অংশ ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন