প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বছরের পর বছর রহস্যজনক কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকার ফলে রংপুর অঞ্চলের একমাত্র রাষ্টায়ত্ব ভারী শিল্প শ্যামপুর সুগার মিলের দেনার পরিমাণ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। গুনেগুনে ৫ বছর ধরে বন্ধ থাকার কারণে মিলটিতে আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই, শ্রমিক-চাষি কিংবা দর্শনার্থীদের আনাগোনা নেই। এক সময়ের জমজমাট ও ব্যস্ততম এলাকা মিল চত্বরটি এখন সন্ধ্যা হলেই ভূতুড়ে পরিবেশে পরিণত হয়। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকায় রোদ-বৃষ্টিতে মূল্যবান মেশিনপত্র ও যানবাহন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ব্যবহার না করায় মরিচা ধরে ভেঙে-খুলে পড়ছে একের পর এক ট্রাক্টর। লোকসান ঠেকাতে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান বজায় রাখতে বিকল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের প্রস্তাবটিও আমলাতন্ত্রের লাল ফিতায় বন্দি হয়ে আছে, ফলে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বিষয়টি রহস্যজনক মনে হচ্ছে। অনেকের ধারণা, মিলটিকে ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
যদিও এই মিলটি চালু হলে একদিকে কয়েক শত বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে রংপুর জেলার ৮টি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় আখ চাষের মাধ্যমে হাজার হাজার কৃষিজীবি ও কৃষক পরিবার উপকৃত হবে। শুধু কৃষক ও কৃষি সম্পৃক্ত মানুষ নয়, এর সাথে আয়ের পথ সুগম হবে আরও অনেক মানুষের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৬৪ সালে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর এলাকায় প্রায় ১’শ ৪৫ একর জমির ওপর নির্মিত হয় শ্যামপুর সুগার মিল। রংপুর অঞ্চলের একমাত্র ভারী শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মাড়াই শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। মিলটির দৈনিক আখ মাড়াইয়ের ক্ষমতা ১ হাজার ১৬ মেঃ টন। সে হিসেবে বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয় ১০ হাজার ১’শ ৬১ টন। বছরে আখ মাড়াই মৌসুমে মিলটি চালু থাকে তিন মাস। চালুর পর থেকেই মিলটি অত্যন্ত সাফল্যের সাথে লাভের মুখ দেখলেও কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা/কর্মচারীর অনিয়ম-দুর্নীতি, অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা এবং নানা কারণে ২০০০ সাল থেকে টানা লোকসানের মুখে পড়ে মিলটি। ব্যাংক ঋণ, ঋণের সুদ, বকেয়া বেতন ও শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন খাত মিলে শেষ পর্যন্ত লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬’শ কোটি টাকায়। এ অবস্থায় শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি মিলটির মাড়াই কার্যক্রম বন্ধের সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমে মিলের কার্যক্রম বন্ধ করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন। এই বন্ধের ঘটনাটির শেষ পরিণতি কী আদমজী পাটকলের অনুরুপ হতে চলেছে? এমন মন্তব্য সচেতন মহলের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিলটি চালু থাকা অবস্থায় ৪শ ৯৩ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। বন্ধের পর অনেকেই অবসর গ্রহণ করেছেন এবং কিছু জনবল অন্য মিলে বদলি করা হয়েছে। অনেকেই এখনও বকেয়া বেতন না পেয়ে এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পেরে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
সরেজমিনে মিলটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া মিলটি এখন গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নিরবে-নিভৃতে পড়ে আছে সব মেশিনপত্র ও পরিবহনগুলো। মিল চত্বরে কর্মচাঞ্চল্য নেই, শ্রমিক-কর্মচারী ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা নেই। ফাঁকা জমিগুলোতে শ্রমিকরা ভুট্টা, আলু ও ধানসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছেন। মিল চত্বরে চরে বেড়াচ্ছে গরু-ছাগল আর ভেড়া। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকার মেশিনগুলোতে মরিচা ধরে ভেঙে পড়ছে। বাইরে পড়ে থাকা আখ পরিবহনে ব্যবহৃত অসংখ্য ট্রাক্টর রোদ-বৃষ্টিতে মরিচা ধরে ভেঙে পড়ছে। ছাউনি ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে মূল্যবান মেশিনগুলির যন্ত্রপাতি মরিচায় ক্ষয়ে যাচ্ছে। গোটা কারখানার ভিতরে গজিয়ে উঠেছে জঙ্গল। দুস্কৃতিকারীরা মেশিনসহ পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক্টরগুলোর যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে গেছে। এলাকাবাসী জানায়, মিলটি বন্ধের পর থেকে এর মূল্যবান সম্পদগুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বেহাত হয়ে যাচ্ছে এবং এখনও যাচ্ছে। এগুলো যেন দেখার কেউ নেই। যে যেভাবে পারছে যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই মিল চত্বরে ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মাদক সেবিদেরও আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে মিল চত্বরটি।
এদিকে, বিষয়গুলি নিয়ে মিল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং শ্রমিক-কর্মচারী ও আখ চাষিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া গেছে। মিল এলাকায় আখ উৎপাদন কমে যাওয়া ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে লোকসানের বোঝা বাড়ছে বলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও তা মানতে নারাজ শ্রমিক-কর্মচারী ও আখ চাষিরা। শ্রমিক-কর্মচারী ও আখ চাষীদের দাবী- সাবেক কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষ জনবল ও অব্যবস্থাপনা সহ নানা কারণে লোকসানে পড়ে মিলটি। আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, পুরনো মেশিনপত্র মেরামত এবং সর্বোপরি দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে চালু করলে যথেষ্ট লাভের মুখ দেখবে। পাশাপাশি মিলের নিজস্ব জায়গায় আলুর কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন এবং পিপি ব্যাগ ও চিনির প্যাকেট তৈরির কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিত্যক্ত সম্পদ ব্যবহার করা যেতে পারে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা বেশ কিছুদিন আগে দেয়া হলেও এখনও তার আলোর মুখ দেখছে না।
মিলের একাধিক শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বেতন-ভাতা বন্ধ থাকার কারণে পরিবার পরিজন নিয়ে অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বিকল্প আয়ের উৎস করতে না পারায় অনেকেই কৃষিকাজ কিংবা অটো চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। চরম আর্থিক সমস্যা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন শ্রমিক-কর্মচারীগণ।
মোস্তাফিজুর রহমান নামের একজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, চিনিকলটি সচল থাকাকালে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক গতি ছিল। মিল চত্বর এবং আশপাশের এলাকা মিলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেন-দেন হতো। কিন্তু এখন এলাকা নিরব-নিস্তব্ধ। কর্মচঞ্চল এলাকাবাসী এখন দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আখচাষিরা বেকার, পরিবহন শ্রমিক ও কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে মিলটি চালু হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে। বদলে যাবে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-যাত্রা।
মিলের অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম একটি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্যামপুর সুগার মিল। এই মিলের সাথে জড়িত ছিল কয়েক হাজার পরিবার। কিন্তু মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারী ও আখ চাষীদের মাঝে দুর্বিষহ অবস্থা বিরাজ করছে। বর্তমানে মিলটি উৎপাদনমুখী করতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মিলের নিজস্ব জায়গায় আলুর কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন এবং পিপি ব্যাগ ও চিনির প্যাকেট তৈরির কারখানা স্থাপনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সেসব প্রস্তাবনা আলোর মুখ দেখছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক ড, আবদুল মজিদ ইনকিলাবকে বলেন, শ্যামপুর চিনিকলের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ততই হবে মঙ্গলজনক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন