প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা। মূলত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানে ভাটাসহ নানা কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। গত চার বছরে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন ৮০ লাখ মানুষ। বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়াসহ যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় তাঁরাও দরিদ্র হয়ে যেতে পারেন। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাংকের মতে, টানা চার বছর ধরে এ দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, মূলত খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে বিবিএস দারিদ্র্য পরিমাপ করে। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন হয়, সেই পরিমাণ আয় করতে না পারলেই ওই ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। তবে খাবারের দাম এলাকাভেদে ভিন্ন হয়।
সূত্রমতে, বাংলাদেশে ২০০১ সালে প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতেন। তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে পরবর্তী দুই দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ সফল হয়। ফলে ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ১৮ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু গত দুই দশকে দারিদ্র্য ধারাবাহিকভাবে কমলেও ২০২২ সালের পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। তখন দারিদ্র্যের হার কমার পরিবর্তে বাড়তে থাকে। বিবিএসের জনশুমারি অনুসারে, ২০২২ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। তখন পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ। জনসংখ্যার ওই হিসাব বিবেচনায় নিলে দেশে এখন কমপক্ষে পৌনে ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। কারণ, গত তিন বছরে জনসংখ্যাও বেড়েছে। আর বিশ্বব্যাংকের হিসাব বিবেচনায় নিলে দেশে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি।
সূত্র আরও জানায়, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা বেড়ে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। ওই বছর নতুন করে ৮ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। ২০২৪ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে সাড়ে ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। ওই বছর নতুন করে মোট ৩৭ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। আর ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে ২১ শতাংশ ছাড়ায়। ওই বছর নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন ১৪ লাখ মানুষ। চলতি বছর ইতিমধ্যে নতুন করে ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার সাড়ে ২২ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে চলতি অর্থবছর শেষে দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। তখন আরও কয়েক লাখ মানুষ দরিদ্র হবেন।
গত চার বছর ধরেই এ দেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে। যদিও আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, তবে ওই কর্মসংস্থান দ্রুত দারিদ্র্য কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে না। তা ছাড়া, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার একটু ওপরে বসবাস করলেও যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় তাঁরা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। মূলত বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কাজের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়া এবং চালসহ নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন। কারণ, আয়ের সুযোগ কমে যাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
এদিকে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এ দেশের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা এখনো মূলত মানুষ দরিদ্র হয়ে যাওয়ার পর সীমিত সহায়তা দেওয়ার মধ্যেই আটকে রয়েছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে আগেই সুরক্ষা দেওয়া, সামাজিক বিমা এবং আয়-ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে দারিদ্র্য বৃদ্ধি শুধু সাময়িক সংকট নয়, বরং প্রবৃদ্ধির গুণগত দুর্বলতা ও শ্রমবাজারের গভীর সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। সে ক্ষেত্রে শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নয়, বরং ওই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, প্রকৃত আয় বাড়াচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে, তা-ই এখন নীতিনির্ধারণের প্রধান বিবেচ্য হওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান জানান, বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র বিশ্বব্যাংক তুলে ধরেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দামের চাপ, প্রকৃত মজুরির ক্ষয়, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না হওয়ায় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ছে। অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির মতো একটি ধাক্কাই অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন