প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরিশাল নগরীর রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর নাজিয়া রহমান মাইশা নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় চিকিৎসায় গাফিলতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন তার স্বজনরা। তাদের দাবি, সিজারিয়ান অপারেশনের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি যথাযথভাবে সামাল দেওয়া যায়নি। একপর্যায়ে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্বজনদের অভিযোগের পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসা নথি, অপারেশন-সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নাজিয়া রহমান মাইশা বরিশাল নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। পরিবারের দাবি, বিয়ের প্রায় এক বছর পর প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত নবজাতকের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক ৭টার দিকে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য নাজিয়া রহমান মাইশাকে রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বজনদের অভিযোগ, ডা. তহুরার তত্ত্বাবধানে অপারেশন শুরু হওয়ার পর একপর্যায়ে জটিলতা দেখা দেয়।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, অপারেশনের সময় নাজিয়া রহমান মাইশার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এরপর দ্রুত তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে হাসপাতালের পক্ষ থেকে তার ‘হার্টবিট কমে গেছে’ বলে জানানো হয় এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য তাকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পরে স্বজনরা নাজিয়া রহমান মাইশাকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নাজিয়ার স্বজনদের অভিযোগ, সিজারিয়ান অপারেশনের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা যথাসময়ে নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
স্বজনদের দাবি, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি হয়ে থাকলে তা নির্ধারণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও চিকিৎসা প্রযুক্তি ও আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা এগিয়ে যাচ্ছে। জটিল রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ, জরুরি চিকিৎসা, রক্তের ব্যবস্থা এবং সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের সুযোগও রয়েছে। তাহলে একজন প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশনের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হলে পরিস্থিতি কেন এত দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে উঠল—এ প্রশ্নের পাশাপাশি এখন সামনে আসছে দায়িত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্নও।
অপারেশনের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার পর রক্তক্ষরণের কারণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক কী কী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন?
রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতির লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট টিমের পক্ষ থেকে কী কী জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল?
রোগীর হার্টবিট কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে তাকে স্থিতিশীল করার জন্য নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না?
রক্ত, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার বা কোন টিমের ছিল এবং সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না?
রোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন, কোন চিকিৎসাগত বিবেচনায় সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রোগীর শারীরিক অবস্থা কী ছিল?
রোগীকে রেফার করার সিদ্ধান্ত যদি আগেই প্রয়োজন হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত নিতে কোনো বিলম্ব হয়েছিল কি না—এ বিষয়টি কি নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা হবে?
রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর আগে তাকে স্থিতিশীল করার জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং স্থানান্তরের সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ছিল?
অপারেশন শুরু থেকে রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও চিকিৎসা ব্যবস্থার লিখিত রেকর্ড রয়েছে কি না, থাকলে সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে কি না?
অপারেশনের সময় জটিলতা দেখা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্সিং টিম এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার প্রত্যেকের দায়িত্ব কী ছিল এবং সেই দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি হয়েছিল কি না—তা কি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন ?
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যদি তদন্তে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব কিংবা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা পাওয়া যায়, তাহলে সেই ঘাটতির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর অভিযোগ বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়; চিকিৎসা নথি, অপারেশন-সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যুর প্রকৃত কারণের পাশাপাশি কোথায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং থাকলে কার দায়িত্বের কোন পর্যায়ে তা ঘটেছে—সেটিই এখন নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বক্তব্য প্রতিবেদনে তুলে ধরার জন্য সংবাদ প্রকাশের আগে তালাশ বিডির বরিশাল অফিসের পক্ষ থেকে ডা. তহুরার সঙ্গে ই-মেইল ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়।
তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, নাজিয়া রহমান মাইশার সিজারিয়ান অপারেশনের সময় কী ধরনের জটিলতা দেখা দিয়েছিল, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে থাকলে তার কারণ কী ছিল এবং তা নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর কী কী জরুরি চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নেওয়া হয়েছিল, কখন ও কী কারণে তাকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, রেফারের আগে রোগীর শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল এবং স্থানান্তরের সময় কী ধরনের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয়েও তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়।
একই সঙ্গে স্বজনদের পক্ষ থেকে ওঠা চিকিৎসায় গাফিলতি, অব্যবস্থাপনা কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যথাসময়ে নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগের বিষয়ে তার সুনির্দিষ্ট বক্তব্য এবং নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যুর বিষয়ে চিকিৎসাগত ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়।
তবে সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত ডা. তহুরার পক্ষ থেকে ই-মেইল, মেসেঞ্জার কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনে যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে।
এ বিষয়ে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাদের কাছে আসেনি। লিখিত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যুর ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন—সিজারিয়ান অপারেশনের সময় জটিলতা দেখা দেওয়ার পর কী কী চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কতটা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল, রোগীকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত যথাসময়ে নেওয়া হয়েছিল কি না এবং পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছিল কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে অপারেশন নোট, রোগীর চিকিৎসা নথি, ব্যবহৃত ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার তথ্য, রেফারেল-সংক্রান্ত কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নার্সিং টিমের বক্তব্য এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ।
যদি তদন্তে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব কিংবা দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যর্থতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায়িত্ব নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যদি অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো পার্থক্য থাকে, সেটিও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; এটি প্রসূতি নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতালের জবাবদিহি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। একটি নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমেই এই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ভূমিকা এবং কোথাও কোনো ঘাটতি থাকলে তার দায়ের বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন