প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ফৌজিহাটের একটি দীর্ঘদিনের বন্ধ থাকা বস্ত্রকলের ৫৫ একর জমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরির কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এই জমিতে।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, এটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি অংশ। জমি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমরা যা কিছুই ব্যবহার করব, তা নিজেরাই তৈরি করব। কারণ বিদেশ থেকে আমদানি করে যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব নয়।"
তবে ফৌজিহাটের এই উদ্যোগটিকে শুধুমাত্র একটি একক প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর বিস্তৃত তাৎপর্য আড়ালেই থেকে যায়। চীন থেকে যুদ্ধবিমান অর্জন, যৌথভাবে চালকবিহীন আকাশযান (ইউএভি বা ড্রোন) উৎপাদন, তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং সম্ভাব্য 'মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে' যোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আলোচনা—সব মিলিয়ে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা নীতি নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
প্রশ্ন হচ্ছে: ২০২৪ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কি তার নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে, নাকি এসব উন্নয়ন দেশের সামরিক আধুনিকায়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ারই অংশ?
বাংলাদেশ নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা, চীন ও তুরস্কের সাথে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং মক্কা জোটে আগ্রহ প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা নীতির রূপরেখাকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করছে। একই সাথে এই পরিবর্তনগুলো ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর এই প্রচেষ্টাটি ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশিদের মধ্যে জাগ্রত হওয়া জাতীয় আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভরতার অনুভূতির সাথে সম্পর্কিত। ওই বছর ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। তিনি উল্লেখ করেন, সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমান আগ্রহেরই একটি প্রতিফলন হলো, "প্রয়োজনে আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে পারি।"
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডোর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী এসব পদক্ষেপকে সরাসরি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফল হিসেবে দেখতে রাজি নন। তিনি বলেন, "সামরিক কৌশল ও পররাষ্ট্রনীতি হলো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। আমি মনে করি না যে কেবল ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মতো একটি একক ঘটনা এই নীতিগুলোর মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে।"
যাই হোক, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে কেবল পুরনো সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
হুমায়ুন কবীরের মতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিবেশও বাংলাদেশের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করছে। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট এবং মিয়ানমার সীমান্ত বাংলাদেশের বড় উদ্বেগের কারণ। তিনি উল্লেখ করেন, মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের প্রভাব বাংলাদেশে এসে পড়ায় নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বাংলাদেশকে একটি সামরিক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি জানান, দেশ মূলত প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ঘাটতিগুলো পূরণ করার চেষ্টা করছে।
নতুন অংশীদার
চীন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রধান উৎস। তবে সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর একটি লক্ষণীয় দিক হলো, চীনের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন আর শুধু তৈরি পোশাক বা অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এবং 'চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ কর্পোরেশন ইন্টারন্যাশনাল'-এর মধ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুবিধাসহ বাংলাদেশে ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কেন্দ্র স্থাপনের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে আগস্টে প্রধান উপদেষ্টার একজন সহকারী জানান, চীনের 'জে-১০সিই' যুদ্ধবিমান ও আক্রমণকারী হেলিকপ্টার কেনার জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
তুরস্কের সাথেও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ সফর করেন এবং উভয় দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে একটি যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা করেন। জুলাই মাসে বাংলাদেশ তুরস্কের সহযোগিতায় বগুড়ায় একটি ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানায়।
ফৌজিহাটের উদ্যোগ এবং বগুড়ার প্রস্তাবিত ড্রোন কারখানা—উভয় পদক্ষেপই বাংলাদেশের একটি নতুন প্রতিরক্ষা নীতির দিকে নির্দেশ করে: দেশটি কেবল সামরিক সরঞ্জামের উৎস বহুমুখী করছে না, বরং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে।
মক্কা জোট এবং আঞ্চলিক হিসেব-নিকেশ
চীন ও তুরস্কের সাথে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যেখানে মূলত অস্ত্র, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, সেখানে 'মক্কা জোট' দেশের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে ভিন্ন প্রশ্ন তুলছে।
২০২৬ সালের আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান 'মক্কা প্রতিরক্ষা জোট' নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশ এর সদস্য না হলেও, ২৭ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সংসদে বলেন যে সদস্য রাষ্ট্রগুলো আগ্রহ দেখালে বাংলাদেশ এতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি "ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে"।
তবে এই জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের 'জোটনিরপেক্ষ' পররাষ্ট্রনীতির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হুমায়ুন কবীর মনে করেন, এই জোটে যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশের উচিত নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতার দিকটি ভালোভাবে চিন্তা করা। তিনি বলেন, "আমরা গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো সামরিক জোটে যোগ দিইনি।" তার মতে সঠিক পথ হলো: "আমরা কারও জোটে যোগ দেব না, তবে সবার সাথেই নিজেদের স্বার্থ বজায় রেখে চলব।"
ইশফাক ইলাহী চৌধুরীও এই জোটে যোগ দেওয়ার কৌশলগত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, বাংলাদেশের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কেন্দ্রিক; তাই সুদূর অঞ্চলের কেন্দ্রিক সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার যৌক্তিকতা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যে নয়াদিল্লির নজর এড়াবে না—তা নিশ্চিত। চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনা এবং মক্কা জোটে সম্ভাব্য অংশগ্রহণ—উভয় বিষয়ই ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসেব-নিকেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে ভারতের অবস্থান হলো বিষয়টি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যে বিষয়গুলো ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে, সেগুলোর ওপর তারা গভীর নজর রাখছে।
বিশ্লেষক ড. দেলোয়ার হোসেন বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের উদ্দেশ্য কোনো দেশকে হুমকি দেওয়া নয়। তবে তিনি একটি মূল উদ্বেগের কথা স্বীকার করে বলেন: "বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বাড়লে বর্তমান বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও হয়তো ভাবতে পারে যে বাংলাদেশ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে কিনা।"
নতুন নির্ভরশীলতা নাকি কৌশলগত স্বাধীনতা?
মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহ করা কি বাংলাদেশকে বৃহত্তর কৌশলগত স্বাধীনতা দেবে, নাকি কেবল এক দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্য দেশের ওপর নতুন নির্ভরতা তৈরি করবে?
অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম তৈরির অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়লে তা বাহ্যিক সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে বিকল্প পথ দেবে। তবে এমন একটি শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রযুক্তি, অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।
বাংলাদেশ কি কোনো নতুন নিরাপত্তা মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে, নাকি মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা কেবল একটি কূটনৈতিক কৌশলের অংশ—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার পথ খোলা রাখলে ভারত ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সাথে দরকষাকষিতে ঢাকা বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। ফলে মূল বিষয়টি কেবল জোটে যোগ দেওয়া না-দেওয়া নয়, বরং এই সুযোগটি অঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থানকে কতটা শক্তিশালী করে তোলে—তা-ই দেখার বিষয়।
সাবেক কূটনীতিক কবীরের মতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা কিংবা অধ্যাপক হোসেনের মতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি দূর করা—যে উদ্দেশ্যই থাক না কেন, দুটি মতামতই একটি বড় সত্যকে তুলে ধরে। বাংলাদেশ যত বেশি তার প্রতিরক্ষা জোরদার করতে চাইবে, তত বেশি এই প্রশ্নটি সামনে আসবে—এই সক্ষমতা কীভাবে তৈরি করা হবে এবং বাস্তবে বিদেশী নির্ভরতা ঠিক কতটা কমানো সম্ভব?
যে জমিতে একসময় সুতা ও কাপড় তৈরি হতো, সেখানে এখন তৈরি হবে অস্ত্র। বাংলাদেশের আগামী দিনের নিরাপত্তা কৌশল কেবল দেশে কী তৈরি হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করার ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন