প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গোপালপুরের গ্রামাঞ্চলে এখনো দেখা যায় খেজুরগাছের সারি। রাস্তার ধারে, বাড়ির আঙিনায় এবং ফসলের মাঠের আইলে অবস্থান করছে এসব গাছ, যা হারিয়ে যেতে বসা এক গ্রামীণ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পরিচর্যা ও সংরক্ষণের অভাবের কারণে খেজুরগাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। যদিও পুরোনো গাছগুলো টিকে আছে, নতুন করে চারা রোপণের কিংবা সংরক্ষণের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, কিছু পুরোনো খেজুরগাছ এখনো সবুজে ভরা। কোথাও গাছের কা-জুড়ে লতাপাতা (পরগাছা) এবং বট-পাকুরগাছ গজিয়েছে, আবার কোথাও গোড়ার চারপাশে ঘন আগাছা দেখা যাচ্ছে। রাস্তার পাশে কিংবা বাড়ির সীমানায় অবস্থিত এসব গাছের অধিকাংশেরই নিয়মিত পরিচর্যার কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, একসময় গোপালপুরের গ্রামাঞ্চলে খেজুরগাছ ছিল প্রতিদিনের পরিচিত দৃশ্য। শীতের মৌসুমে গাছিরা খেজুরগাছের কা- পরিষ্কার করে রস সংগ্রহ করতেন। সেই রস দিয়ে তৈরি হতো খেজুরের গুড় ও পাটালি। শীতের সকালে খেজুরের রস ঘিরে জমে উঠত গ্রামীণ উৎসবের আমেজ।
কালের পরিবর্তনে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহের ঐতিহ্য যেমন কমেছে, তেমনি নতুন খেজুরগাছ লাগানোর প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। ফলে বিদ্যমান গাছগুলো বয়সের ভারে নষ্ট হয়ে গেলে সেগুলোর জায়গা পূরণ করার মতো নতুন গাছ তৈরি হচ্ছে না।
গোপালপুরের গুড় ব্যবসায়ী সন্তোষ পাল জানান, স্থানীয়ভাবে খেজুরের গুড়ের চাহিদা থাকলেও এলাকায় উৎপাদন না হওয়ায় তাদের বাইরের অঞ্চল থেকে গুড় সংগ্রহ করতে হয়। তিনি বলেন, “প্রতি বছর বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রায় একশ মণেরও বেশি খেজুরের গুড় এনে গোপালপুর ও আশপাশের এলাকায় বিক্রি করি।”
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, “এখনো অনেক খেজুরগাছ আছে। কিন্তু গাছগুলোর যতœ নেওয়ার মানুষ কমে গেছে। পুরোনো গাছ নষ্ট হলে নতুন গাছ লাগানোও হয় না। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছর পর খেজুরগাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।”
গোপালপুর সকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক (কৃষি), ফারুক আহম্মদ বলেন, খেজুরগাছ গ্রামীণ পরিবেশ ও কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ গাছ। নতুন করে খেজুরের চারা রোপণ ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কৃষকদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করা গেলে খেজুরগাছের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।
পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিদের মতে, খেজুরগাছ শুধু রস ও গুড়ের উৎস নয়, এটি গ্রামীণ প্রকৃতি ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাস্তার পাশে ও পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে খেজুরের চারা রোপণ করা হলে একদিকে যেমন পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়বে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনের ঐতিহ্যও টিকে থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে খেজুরগাছ সংরক্ষণ ও নতুন চারা রোপণের উদ্যোগ এবং একই সঙ্গে পুরোনো গাছগুলোর তালিকা তৈরি করে সেগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গোপালপুরের পথে-প্রান্তরে এখনো দাঁড়িয়ে থাকা এসব খেজুরগাছ যেন কালের সাক্ষী। কিন্তু এখনই সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে একসময় গাছ থাকবে না, থাকবে শুধু স্মৃতিÑআর হারিয়ে যাবে শীতের ভোরে খেজুরের রস ও গুড়কে ঘিরে থাকা গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন