প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৭:৫৪ এম || প্রকাশের তারিখঃ ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ইং; ০৭:০৬ পি.এম
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সমুদয়কাঠী ইউনিয়নে জমি দখল, ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙচুর, কষ্টিপাথরের মূর্তি চুরি, সংখ্যালঘু পরিবারকে ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে শফিকুল ইসলাম হাওলাদারের বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত শফিকুল ইসলাম হাওলাদার সমুদয়কাঠি ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, সমুদয়কাঠী গ্রামের মৃত মাখন লাল আইচের ছেলে সমীর রঞ্জন আইচ ও উত্তম আইচ ১৯৯৮ সালের ২৩ মার্চ তিনটি রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে তাদের সম্পত্তির একটি অংশ আব্দুর রহমান হাওলাদারের দুই ছেলে শফিকুল ইসলাম হাওলাদার ও সিদ্দিকুর রহমান হাওলাদারের কাছে যৌথভাবে বিক্রি করেন। পরবর্তীতে ওই সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, শফিকুল ইসলাম অপর ক্রেতা সিদ্দিকুর রহমানকে বাদ দিয়ে একটি অনিবন্ধিত চুক্তিপত্রের ভিত্তিতে আদালতে একতরফা ডিক্রি নেন। স্থানীয়দের দাবি, ওই ডিক্রিকে কেন্দ্র করে বিপুল পরিমাণ জমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আদালতের নথি ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র যাচাই ছাড়া অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সমুদয়কাঠী এলাকায় কয়েকটি হিন্দু পরিবারের জমি ও বসতভিটা নিয়ে শফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। ‘মুন্সি বাড়ি’ নামে পরিচিত রবি মুন্সি, সুমন মুন্সি ও সুজন মুন্সির পারিবারিক জায়গা দখল এবং তাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া ‘ধোপা বাড়ি’র বিমল ধোপা, অমল ধোপা ও মানিক ধোপার বসতভিটার জমি নিয়েও দখলের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, সমুদয়কাঠী ইউনিয়ন বোর্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট যতীন আইচ ইউনিয়ন পরিষদের জন্য দান করেছিলেন এমন একটি পুকুর ও সরকারি রাস্তার সংলগ্ন কয়েক বিঘা জমি নিয়েও বিরোধ রয়েছে। সেখানে বাগান করার অভিযোগও করেছেন তারা। তবে এসব জমির প্রকৃত মালিকানা, সরকারি সম্পত্তির অবস্থান ও দখলের বিষয়টি ভূমি রেকর্ড, খতিয়ান, দলিল এবং সরেজমিন পরিমাপের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মঠ-মন্দির ভাঙচুর ও মূর্তি চুরির অভিযোগ
এলাকার একটি পুরোনো মঠ ও মন্দির ভেঙে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী শীতলা মন্দিরের জায়গা দখলের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, সমীর আইচের বাড়ির ভেতরে থাকা তিনটি মন্দিরের মধ্যে একটি কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি এবং একটি কষ্টিপাথরের সরস্বতী মূর্তি চুরি করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
তবে মূর্তি দুটি বর্তমানে কোথায় রয়েছে, আদৌ চুরি বা পাচারের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়রা এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত দাবি করেছেন।
ওয়ান-ইলেভেনের সময় দুই সিন্দুক নিয়ে রহস্য
শফিকুল ইসলামের বাড়ি থেকে ওয়ান-ইলেভেনের সময় রাতে দুটি বড় সিন্দুক সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে ঘিরেও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ওই সময় প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন ব্যক্তি মোটা বাঁশের সাহায্যে দুটি বড় সিন্দুক বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সেগুলো ট্রলারে তোলার প্রস্তুতি চলছিল। বিষয়টি জানতে পেরে তৎকালীন সমুদয়কাঠী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমুল ইসলাম সাঈদ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দেন বলে তাদের দাবি।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে নাজমুল ইসলাম সাঈদ ও তার সঙ্গে থাকা জাকির হোসেন খানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কয়েক দিন পর বেকুটিয়া ফেরিঘাট এলাকার ‘নাক পোড়া এনামুল’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি শফিকুল ইসলামের বাড়িতে এসে ওই সিন্দুকসহ আরও কিছু মালামাল তিনটি ট্রলারে করে নিয়ে যান বলেও স্থানীয়দের দাবি। তবে সিন্দুক দুটির ভেতরে কী ছিল, কোথায় নেওয়া হয়েছিল এবং ওই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি কেবল স্থানীয়দের দাবির পর্যায়েই রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের অভিযোগ
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে শফিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সমুদয়কাঠী ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি হন বলে তারা দাবি করছেন।
এলাকাবাসীর কেউ কেউ শফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ করেছেন।
শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর পোশাক ব্যবহার করে গভীর রাতে এলাকায় ঘোরাফেরা এবং সংখ্যালঘু পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
একই সঙ্গে তিনি কখনো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন কি না, করে থাকলে তার চাকরির রেকর্ড কী এবং সেনাবাহিনীর পোশাক তার কাছে কীভাবে এসেছে এসব বিষয়ও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, জমি দখল, ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙচুর, মূর্তি চুরি বা পাচার, সরকারি সম্পত্তি দখল এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তারা অভিযোগকৃত জমির দলিল, খতিয়ান ও নামজারি যাচাই, সরকারি ও ধর্মীয় সম্পত্তি সরেজমিনে পরিমাপ, পুরোনো মঠ-মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব যাচাই, মূর্তি দুটির সন্ধান, সেনাবাহিনীর পোশাক ব্যবহারের অভিযোগ এবং ওয়ান-ইলেভেনের সময়ের দুই সিন্দুকের ঘটনা নিয়ে পুরোনো নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগের কোনো অংশ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা হোক।
শফিকুল ইসলাম হাওলাদারের সঙ্গে এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের আহবায়ক অশোক সিকদার বলেন, নেছারাবাদ উপজেলার সমুদয়কাঠী ইউনিয়নে জমি দখল, ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙচুর, কষ্টিপাথরের মূর্তি চুরি এবং সংখ্যালঘু পরিবারকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের গুরুতর অভিযোগ পেয়েছি। সমুদয়কাঠী এলাকার ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পিরোজপুর জেলা প্রশাসন, নেছারাবাদ উপজেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি এবং ষড়যন্ত্রকারীদের দ্রুত আইনের আওতাধীন করার দাবী জানাচ্ছি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন