প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজধানী থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছানোর জন্য ফেরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো একসময়। তবে পদ্মা সেতু চালুর ফলে সেই পরিস্থিতি এখন পরিবর্তিত হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার পথ এখন অনেক কম সময়ে পার করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু এই যাতায়াতের সুবিধার বিপরীতে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুতগতির যানবাহন, পাল্লা দিয়ে ওভারটেকিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। কোনো ঘটনায় একাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, আবার কোনো দুর্ঘটনায় কেউ সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়ছেন। ফলে স্বজন হারিয়ে পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় চার বছরের মধ্যে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে (পদ্মাসেতু-ভাঙ্গা) ২১৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৬৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১১২ জন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনাগুলোতে ৮৪টি মামলা দায়ের হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২৮ জন পুরুষ, ৩৩ জন নারী এবং ৮ জন শিশু রয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে স্থানীয়রা অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, চালকদের অসতর্কতা, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং প্রতিকূল আবহাওয়াকে উল্লেখ করেছেন। এক্সপ্রেসওয়েতে নির্ধারিত গতির পরিবর্তে অনেক যানবাহনকে একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিতে দেখা যায়। সামনে থাকা গাড়িকে অতিক্রম করার সময় পাশের লেন দখল, হঠাৎ ব্রেক এবং নিরাপদ দূরত্ব না রাখার কারণে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। কোনো গাড়ি বিকল হয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে পড়লে পেছন থেকে আসা দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য তা প্রাণঘাতী ফাঁদ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে এক্সপ্রেসওয়েতে গতি নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশি নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
২০২৩ সালের ১৯ মার্চ সকালে মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে ইমাদ পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। এতে চালকসহ ২০ জন নিহত হন। ওই দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনো স্থানীয়দের মনে তাড়া করে বেড়ায়। কিন্তু এরপরও দুর্ঘটনার ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।
কুতুবপুরের বাসিন্দা সাকিব হাসান অভিযোগ করেন, এক্সপ্রেসওয়েতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে আগের মতো কার্যকর নজরদারি দেখা যায় না। তিনি বলেন, "২০২৩ সালে কুতুবপুরেই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ২০ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। এখনো অনেক যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলে। আগের মতো পুলিশের তৎপরতা দেখা যায় না। নিয়মিত স্পিড গান ব্যবহার করে গতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বা আইনি কঠোর প্রয়োগ করলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমানো সম্ভব।"
শুধু গতিই নয়, যাত্রী ওঠানামার অনিয়মও এই সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শিবচরের পাঁচ্চর গোলচত্বর এলাকায় অনেক পরিবহনকে যাত্রী তোলার জন্য এক্সপ্রেসওয়ের পাশে থামতে দেখা যায়। অথচ যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য সেখানে যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে। সেটি যথাযথভাবে ব্যবহার না হওয়ায় যাত্রীদের এক্সপ্রেসওয়ের রেলিং টপকে গাড়িতে উঠতে হচ্ছে। এতে একদিকে যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে যাত্রীরাও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
বাস চালক এমদাদুল ইসলাম বলেন, "শুধু বাস বা ট্রাকচালকদের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে না। মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি অতিক্রম এবং পথচারীদের হঠাৎ রাস্তা পারাপারও দুর্ঘটনার কারণ।"
মোটরসাইকেল চালক মেহেদী হাসান জানান, পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর অনেক পরিবহন একে অপরকে ওভারটেক করার প্রতিযোগিতায় নামে। তাদের বেপরোয়া গতির কারণে এক্সপ্রেসওয়েতে মোটরসাইকেল চালানো এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে এখন মূল এক্সপ্রেসওয়ে এড়িয়ে নিচের বিকল্প বাইপাস সড়ক দিয়ে চলাচল করছেন। দুর্ঘটনা কমাতে বাসসহ সব ধরনের যানবাহনের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা ইমন আহমেদ বলেন, "দুর্ঘটনার পর প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এই ভাঙ্গা হাইওয়েতে দুর্ঘটনা ঘটলে আহত ব্যক্তিদের শিবচর অথবা ঢাকায় নিতে হয়। এতে অনেক সময় লেগে যায়। আড়িয়াল খাঁ সেতুর পাশে নির্মিত ট্রমা সেন্টারটি চালু করা গেলে অনেক আহত ব্যক্তির প্রাণ বাঁচানো সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস। সরকারের কাছে দাবি, দ্রুত এটি চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।"
হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোমতাজুল এহসান আহমেদ হুমায়ুন বলেন, "এক্সপ্রেসওয়েতে আমাদের এআই প্রকল্প রয়েছে। এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। প্রকল্পটি চালু হলে ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থেকে যানবাহনের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। স্পিড গান ব্যবহারের কার্যক্রম একেবারে বন্ধ নেই, সীমিত পর্যায়ে চলছে। যাতে মানুষের হয়রানি না হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু পুলিশি নজরদারি নয়, চালক ও যাত্রীদেরও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। সবার সম্মিলিত সচেতনতাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন