প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুংফু ও নাচের ক্ষেত্রে চীনা রোবটগুলো চমক দেখালেও, কারখানার বেশিরভাগ কাজে তারা এখনও পিছিয়ে রয়েছে। চীন দ্রুত রোবট তৈরি করছে, তবে বাজারে এর চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে।
ফলে, প্রয়োজনের তুলনায় অধিক রোবট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ চীনের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে শতাধিক হিউম্যানয়েড রোবটকে বিভিন্ন কাজ শেখানো হচ্ছে। প্রশিক্ষকেরা রোবটগুলোকে বাক্স গোছানো, নুডলস প্যাকেট করা এবং কফি তৈরির মতো কাজ শেখাচ্ছেন। তবে, রোবটগুলো এখনও ধীর এবং কিছুটা আনাড়ি।
রোবটগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতে কন্ট্রোলার ব্যবহার করা হচ্ছে। রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেক এই প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জন্য ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের সরকারি চুক্তি পেয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো রোবটকে বাস্তব জগতের কাজ শেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ডেটা তৈরি করা।
চীনে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে শ্রমনির্ভর কাজে হিউম্যানয়েড রোবটের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে, এসব রোবট এখনও সাধারণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণরূপে অর্জন করতে পারেনি। পূর্বনির্ধারিত কাজের বাইরে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হলে তারা সমস্যায় পড়ে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের রোবট নির্মাতারা উন্নত হার্ডওয়্যার তৈরি করলেও, রোবটের বুদ্ধিমত্তা এবং বাস্তব কাজের সক্ষমতা এখনও সীমিত। অনেক প্রদর্শনীতে রোবটের নাচ বা বিভিন্ন কৌশল দেখা গেলেও, এসব কাজ আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা থাকে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বে প্রায় ২০ হাজার হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করা হয়েছে।
এর ৯৫ শতাংশই ছিল চীনা কোম্পানির তৈরি। চীন এ বছর ১ লাখের বেশি হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে। তবে, প্রযুক্তিটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় এর বুদ্ধিমত্তা, নির্ভরযোগ্যতা, কর্মদক্ষতা এবং উৎপাদন খরচ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারি ভর্তুকি এবং বিনিয়োগের কারণে উৎপাদন দ্রুত বাড়লেও, প্রকৃত বাজার চাহিদা এখনও সীমিত।
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, মানুষের মতো দেখতে হিউম্যানয়েড রোবট সব কাজের জন্য অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নয়। নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি রোবটিক হাত তুলনামূলকভাবে সস্তা, নির্ভরযোগ্য এবং শিল্পকারখানায় ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্লেষক পো ঝাও বলেন, বর্তমানে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যাপকভাবে ব্যবহারের মতো অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি হয়নি। তবে, বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে এসব রোবটের ব্যবহার বাড়বে, এই আশায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছেন।
মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইন্টারকানেক্টেড ক্যাপিটালের কেভিন শু বলেন, ভবিষ্যতে এই খাতে অনেক কোম্পানি টিকে থাকতে না পারায় একীভূতকরণ বা কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৫০টির বেশি হিউম্যানয়েড রোবট কোম্পানি রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে চীনের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকার হিউম্যানয়েড রোবট এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কিনতে অন্তত ২৩ কোটি ডলার খরচ করেছে। এক বছর আগে একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার।
চীন বিভিন্ন এলাকায় হিউম্যানয়েড রোবটের প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্টেট গ্রিডও বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে হিউম্যানয়েড রোবট, রোবটিক ব্যবস্থা এবং রোবট কুকুর ব্যবহারে ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
শেনঝেন শহর আগামী বছরের মধ্যে হিউম্যানয়েড ও ‘এমবডিড এআই’ প্রযুক্তি নিয়ে ১ হাজার ২০০টির বেশি কোম্পানির একটি ১৫ বিলিয়ন ডলারের শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে।
চীনে হিউম্যানয়েড রোবট খাতে বড় বিনিয়োগের ফলে কম খরচে সরবরাহব্যবস্থা তৈরি এবং দ্রুত প্রশিক্ষণ ডেটা সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে, অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে ভবিষ্যতে বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
নিউইয়র্কের এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষক লিজ্জি লি বলেন, সরকারি ভর্তুকি এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং দাম কমে যায়। এতে অনেক কোম্পানি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউবিটেক এবং ইউনিট্রির মতো কয়েকটি চীনা কোম্পানি এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ভালো অবস্থানে রয়েছে। ইউনিট্রি ১৯ আগস্ট সাংহাই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেই এর শেয়ারের দাম পাঁচ গুণের বেশি বেড়ে যায়। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। পরে অবশ্য দাম কিছুটা কমে।
চীনে হিউম্যানয়েড রোবটের বাজার এখনো অনেকটাই সরকারি ক্রয় এবং ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। বেইজিংয়ের ই-টাউন এলাকায় রোবট কোম্পানিগুলোকে বিক্রয় ভর্তুকি, বিনামূল্যে কর্মস্থল এবং অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে, সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ডিপ রোবোটিক্সের গত বছরের ৪২ লাখ ডলার নিট লাভের প্রায় ৪২ শতাংশই এসেছিল সরকারি ভর্তুকি থেকে।
এদিকে, ইউবিটেক গত বছরের শেষ তিন মাসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অন্তত ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের নতুন চুক্তি পেয়েছে। প্রতিযোগিতা বাড়ায় হিউম্যানয়েড রোবটের দামও কমছে। মরগ্যান স্ট্যানলির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রোবটের গড় দাম আরো ১৫ শতাংশ কমতে পারে।
নাচের রোবটের ভাড়াও কমেছে। প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত এসব রোবট এখন দিনে ৪৪০ থেকে ৬০০ ডলারে ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে গত বছর ভাড়া ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার।
চীনে হিউম্যানয়েড রোবটের ব্যবহার এবং উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে। নাচ এবং বক্সিংয়ের মতো প্রদর্শনীর মাধ্যমে এসব রোবট জনপ্রিয় হলেও, বাস্তব কর্মক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কাজে প্রচলিত রোবটিক আর্ম এখনও হিউম্যানয়েডের চেয়ে দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য।
শাওমির বেইজিংয়ের বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানায় অ্যাসেম্বলি কাজের ৯১ শতাংশ স্বয়ংক্রিয়। সেখানে ৭০০টির বেশি শিল্প রোবট কাজ করছে। শাওমি হিউম্যানয়েড রোবটকে নাট লাগানোর মতো কাজে প্রশিক্ষণ দিলেও, উৎপাদন লাইনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনও প্রচলিত রোবট এবং স্বয়ংক্রিয় যানবাহনই করছে।
হিউম্যানয়েড রোবটের কিছু বাণিজ্যিক ব্যবহারও শুরু হয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান গ্যালবট দুই ডজনের বেশি শহরের ফার্মেসিতে রোবট ব্যবহার করছে। বেইজিংয়ের একটি ফার্মেসিতে রোবট ডিজিটাল অর্ডার পাওয়ার পর শেলফ থেকে ওষুধ তুলে প্রস্তুত করে। কোম্পানির দাবি, এসব রোবটের সফলতার হার ৯৫ শতাংশের বেশি।
তবে, হিউম্যানয়েড রোবটের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। আলো, বস্তু বা সরঞ্জামের অবস্থান সামান্য বদলালেই অনেক সময় রোবট কাজটি ঠিকভাবে করতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মতো পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করতে আরও অনেক উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এ জন্য চীন বিপুল পরিমাণ প্রশিক্ষণ ডেটা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। বিশ্লেষক পো ঝাওয়ের মতে, বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ ঘণ্টার উচ্চমানের প্রশিক্ষণ ডেটা রয়েছে, অথচ উন্নত শারীরিক বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রায় ১০ কোটি ঘণ্টার ডেটা প্রয়োজন।
চীনে রোবটের সংখ্যা বাড়লেও, বাজারে অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তা মনে করছেন, ২০২৬ সালের শেষ দিকে বা ২০২৭ সালে এ খাতে বড় ধরনের একত্রীকরণ শুরু হতে পারে। সরকারি ভর্তুকি কমে গেলে দুর্বল কোম্পানিগুলো টিকে থাকতে নাও পারে।
চীনের শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা এবং সরকারি সহায়তার কারণে রোবটের যন্ত্রাংশের দাম দ্রুত কমছে। তবে, এর ফলে কোম্পানিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলেও চীনের রোবটের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী থাকতে পারে।
চীনের হিউম্যানয়েড রোবটের বাজার এখনো অনেকটাই সরকারি ক্রয় এবং ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল। বেইজিংসহ বিভিন্ন শহর রোবট কোম্পানিকে বিক্রয় ভর্তুকি, বিনামূল্যে কর্মস্থল এবং অন্যান্য সুবিধা দিচ্ছে।
সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতার বিষয়টি কোম্পানিগুলোর আর্থিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে। ডিপ রোবোটিক্সের গত বছরের ৪২ লাখ ডলার নিট লাভের প্রায় ৪২ শতাংশ এসেছে সরকারি ভর্তুকি থেকে। অন্যদিকে, ইউবিটেক গত বছরের শেষ তিন মাসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অন্তত ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের নতুন চুক্তি পেয়েছে।
প্রতিযোগিতা বাড়ায় হিউম্যানয়েড রোবটের দামও কমছে। মরগ্যান স্ট্যানলির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রোবটের গড় দাম আরো ১৫ শতাংশ কমতে পারে। প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত নাচের রোবটের ভাড়াও গত বছরের প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার থেকে কমে বর্তমানে দিনে ৪৪০ থেকে ৬০০ ডলারে নেমেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের হিউম্যানয়েড রোবট এখনো ধীর এবং ত্রুটিপ্রবণ। লিউঝৌর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের এক কর্মীর দাবি, সাধারণ কাজে রোবটগুলো এখনো মানুষের গতি এবং দক্ষতার প্রায় ২০ শতাংশে কাজ করতে পারে। তবে, আগামী দুই থেকে তিন বছরে এই ব্যবধান অনেকটাই কমে আসতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন