প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিশ্বের প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যের চিকিৎসকেরা সফলভাবে মস্তিষ্কের টিউমার অপসারণ করেছেন। এই অস্ত্রোপচারের ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
এই তথ্যটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের বেডফোর্ডশায়ারের ৪৮ বছর বয়সী রিস হিবার্ট, যিনি দুই সন্তানের বাবা এবং পেশায় গ্রাহকসেবা ব্যবস্থাপক, দেড় বছর আগে পর্যন্ত সুস্থ জীবনযাপন করছিলেন। প্রতিদিন দুপুরের খাবারের বিরতিতে প্রায় দুই মাইল হাঁটতেন তিনি।
একদিন হাঁটার সময় হঠাৎ করে তিনি রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়েন এবং খিঁচুনি শুরু হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, তার মস্তিষ্কে একটি বড় টিউমার রয়েছে। যদিও টিউমারটি ক্যানসারযুক্ত ছিল না, তবে এটি দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। সময়মতো অস্ত্রোপচার না করলে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর সম্ভাবনা ছিল।
এরপর ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হাসপাতালের চিকিৎসকেরা হিবার্টের অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। এই অস্ত্রোপচারে প্রথমবারের মতো সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়া হয়।
চিকিৎসকেরা জানান, হিবার্টের মাথার খুলির নিচে মার্বেলের মতো একটি পিটুইটারি গ্রন্থিতে ১১ মিলিমিটার আকারের টিউমারটি ছিল। এই গ্রন্থি শরীরের বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া, রক্তচাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
টিউমারটির অবস্থান ছিল ক্যারোটিড ধমনির খুব কাছে, যা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করে। একই এলাকায় দৃষ্টিশক্তি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু অবস্থিত। ফলে অস্ত্রোপচারের সময় সামান্য ভুলও গুরুতর ক্ষতির কারণ হতে পারত।
টিউমারটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিবার্টের পার্শ্বদৃষ্টি কমতে থাকে। পরে বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং মাথা ঘোরানোর সমস্যা দেখা দেয়।
অস্ত্রোপচারের সময় নাকের ভেতর দিয়ে একটি সরু ক্যামেরাযুক্ত যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে মাথার খুলির নিচে পৌঁছান চিকিৎসকেরা। তবে হাড় ও শক্ত ঝিল্লির আড়ালে থাকা রক্তনালি, স্নায়ু ও টিউমারের অবস্থান সরাসরি দেখা কঠিন ছিল।
এ সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থা চিকিৎসকদের সহায়তা করে। অস্ত্রোপচারের সরাসরি দৃশ্য বিশ্লেষণ করে এটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান চিহ্নিত করে এবং টিউমার অপসারণের জন্য নিরাপদ জায়গাগুলোও নির্দেশ করে।
এই প্রযুক্তি মানুষের মুখ শনাক্ত করার ব্যবস্থার মতো কাজ করে, তবে এটি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক সময় আড়ালে থাকা শারীরিক কাঠামো শনাক্ত করতে সক্ষম।
গবেষকেরা পিটুইটারি টিউমার অপসারণের শত শত অস্ত্রোপচারের ভিডিও ব্যবহার করে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ভিডিওগুলোতে রক্তনালি ও স্নায়ুর অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল, যা ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কাঠামো শনাক্ত করতে শেখায়।
অস্ত্রোপচারে সহায়তা করা অধ্যাপক হানি মার্কাস জানান, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যে পরিমাণ অস্ত্রোপচার সারাজীবনে দেখেন বা করেন, তার চেয়ে বেশি অস্ত্রোপচারের তথ্য দিয়ে এই ব্যবস্থা প্রশিক্ষিত হয়েছে। ফলে এটি চিকিৎসকের জন্য একজন বিশেষজ্ঞের ‘দ্বিতীয় জোড়া চোখের’ মতো কাজ করতে পারে।
তবে চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করেছেন, অস্ত্রোপচারের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করেছে।
চিকিৎসকদের মতে, ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচারকক্ষে একজন অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞের মতো কাজ করবে এমন ব্যবস্থা তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য। চিকিৎসকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারবেন এবং প্রয়োজন মনে না করলে তা গ্রহণ না করার স্বাধীনতাও থাকবে।
গবেষক দলটি কয়েক বছর ধরে গবেষণাগারে এই প্রযুক্তি পরীক্ষা ও উন্নয়ন করেছে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থা ও গুগলের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণার প্রথম বাস্তব অস্ত্রোপচারের ফল নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। এখন আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা চালানোর প্রস্তুতি চলছে।
অস্ত্রোপচারের পর নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে হিবার্ট বলেন, চোখ খোলার পর তার মনে হয়েছিল যেন পুরো চারপাশের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন। অস্ত্রোপচারের পর আট সপ্তাহে তার দৃষ্টিশক্তি কয়েক দিন পরপর আরও উন্নত হয়েছে।
হিবার্ট জানান, তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে এসেছে এবং অস্ত্রোপচারের আগে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো ছিল, সেগুলোও চলে গেছে। তার ভাষায়, অস্ত্রোপচারটি তাকে যেন আবার নিজের জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য উদ্ভাবনবিষয়ক মন্ত্রী জেমস ফ্রিথ এই অস্ত্রোপচারকে জীবন বদলে দেওয়া ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সূত্র: বিবিসি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন