প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
॥ মোতাহার হোসেন ॥
ঢাকা, ২ অক্টোবর, ২০২৬ : বড় ধরনের ভূমিকম্পের ফলে যদি কোনো ফায়ার স্টেশন বা হেডকোয়ার্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে উদ্ধার তৎপরতা যাতে অব্যাহত থাকে, সেই উদ্দেশ্যে জনবল, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং কমান্ড কাঠামোকে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
এই উদ্যোগের আওতায় ঢাকা এবং এর আশপাশের ৪১টি পয়েন্টে উদ্ধার সরঞ্জাম বিতরণ করা হচ্ছে, পূর্বাচলে একটি বিশেষ রেসকিউ টিম মোতায়েন করা হচ্ছে, বিভাগীয় শহরগুলোতে আলাদা রেসকিউ টিম গঠন করা হচ্ছে এবং ঢাকার আশপাশের ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসসকে জানান, বড় ধরনের ভূমিকম্পের সময় একাধিক স্থানে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে ফায়ার সার্ভিসের জনবল, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং কমান্ড ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্প বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি ১০০ বছরে একটি বড় ভূমিকম্প ঘটে, যা মেজর ভূমিকম্প বা মেগা ডিজাস্টার হিসেবে পরিচিত। দেশে বড় স্কেলের ভূমিকম্প হওয়ার শতবর্ষ পার হয়ে যাওয়ায় যে কোনো সময় বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে—এমন একটি উদ্বেগ বিদ্যমান। তবে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হলেও ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এখনও কার্যকর পূর্বাভাস প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি।
এ কারণে ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, তা আগে থেকেই শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
বিকেন্দ্রীকরণে কমান্ড ব্যবস্থা সচল রাখার উদ্যোগ
ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভূমিকম্পসহ যেকোনো দুর্যোগে উদ্ধার কার্যক্রম কমান্ডের ওপর নির্ভর করে।
যদি ভূমিকম্পে পুরান ঢাকার সদর দপ্তর ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে কমান্ড ব্যবস্থা সচল রাখতে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দুজন পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কমান্ড কর্মকর্তাদের মিরপুরে অফিস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সদর দপ্তরের মিডিয়া উইংয়ের মূল অংশও সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি মিরপুর-১০-এর ট্রেনিং কমপ্লেক্সের কার্যক্রম পূর্বাচলের নতুন মাল্টিপারপাস ট্রেনিং কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়েছে।
মিরপুরে নির্মাণ করা হচ্ছে ভূমিকম্প প্রতিরোধক সদর দপ্তর ভবন
পুরান ঢাকার সদর দপ্তর ভবন নিয়ে ঝুঁকি থাকায় ঢাকার মিরপুরে একটি ভূমিকম্প প্রতিরোধক বহুতল সদর দপ্তর ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি-জাইকার সহযোগিতায় মিরপুর ১০-এ নির্মাণাধীন এই ভবনে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘বেজ আইসোলেশন প্রযুক্তি’ ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির ফলে ভবনটি ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়বে না। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ২০২৮ সালে এর বাস্তবায়ন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তখন ফায়ার সার্ভিসের পুরো অধিদপ্তর সেখানে স্থানান্তরিত হবে।
৪১ পয়েন্টে উদ্ধার সরঞ্জাম বিকেন্দ্রীকরণ
ফায়ার সার্ভিসের অন্যান্য স্টেশনগুলোতে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল ও সরঞ্জাম থাকলেও, হেডকোয়ার্টারে বেশিরভাগ অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম রাখা হতো। ভূমিকম্পে হেডকোয়ার্টার ভবন ধসে পড়লে এসব সরঞ্জাম আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা উদ্ধার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই কারণে ঢাকা ও এর আশপাশের ৪১টি পয়েন্টে এসব সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়েছে। ফলে কোনো ফায়ার স্টেশন ভূমিকম্পে আটকে গেলে নিকটস্থ ফায়ার স্টেশন থেকে সরঞ্জাম এনে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বিশেষ রেসকিউ টিম গঠন
ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগে ফায়ার স্টেশনের জনবল পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। এই কারণে এসআরটি বা স্পেশাল রেসকিউ টিম গঠন করা হয়েছে। ঢাকার পূর্বাচলে ৫০ থেকে ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ টিম রাখা হয়েছে, যা দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করবে। একইভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর বিভিন্ন স্টেশন থেকে জনবল এনে প্রতিটি বিভাগীয় সদর দপ্তরে ২০ সদস্যের একটি করে এসআরটি টিম গঠন করা হয়েছে। তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাতে এ ধরনের দুর্যোগে কলাপসড স্ট্রাকচার সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অপারেশন পরিচালনা করতে পারে।
ঢাকার সহায়তায় ১০০ ফায়ার স্টেশন প্রস্তুত
ভূমিকম্পের কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এই কারণে বিভাগীয় শহরের বাইরে ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে এয়ারমার্ক করা হয়েছে, যাতে মহানগরীর কোনো স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো সম্ভব না হলে এসব স্টেশন থেকে জনবল ও সরঞ্জাম নিয়ে সহায়তা করা যায়। রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেলে হেলিকপ্টারে উদ্ধার সরঞ্জাম ও রেসকিউ টিম স্থানান্তরের বিষয়েও বিমান বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় সরঞ্জাম দেওয়ার উদ্যোগ
ভূমিকম্প মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ অধিদপ্তরের সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুর্যোগে উদ্ধার অভিযানের সময় ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। ভূমিকম্প-সম্পর্কিত দুর্যোগ ও মেগা ডিজাস্টারে কাজ করার জন্য ফায়ার সার্ভিসকে ইকুইপমেন্ট ও সরঞ্জাম সরবরাহ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কিছু সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে কমিউনিকেশন এক্সারসাইজ
বড় অগ্নিকাণ্ড বা মেগা ভূমিকম্পের সময় ওয়্যারলেস কভারেজ ও মোবাইল টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফায়ার সার্ভিসের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আরাব) সহায়তায় গত আগস্টে দেশব্যাপী কমিউনিকেশন এক্সারসাইজ করা হয়েছে। এতে বেতার, মোবাইল ও ল্যান্ড টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে—এমন পরিস্থিতি তৈরি করে বিভিন্ন ফায়ার স্টেশনের যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার মহড়া দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাসস’কে বলেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে এবং ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এ ঝুঁকি বেশি। তাই সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ছোট-বড় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, নিয়মিত মহড়া এবং সেগুলোর মনিটরিং ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
তিনি বলেন, বড় ভূমিকম্প মোকাবিলা উন্নত দেশগুলোর জন্যও কঠিন। বাংলাদেশেও এ ধরনের দুর্যোগে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে বিদ্যমান সক্ষমতা নিয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বাসস’কে বলেন, বড় ভূমিকম্পের পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত বিপর্যয় মোকাবিলা করা। বিশেষ করে ভবনধস, মানুষের আটকে পড়া, গ্যাসলাইন থেকে অগ্নিকাণ্ড এবং বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তিনি বলেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে সরু সড়ক, যানজট, অবৈধ পার্কিং ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারী গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের স্থিতিশীলতা যাচাই না করে উদ্ধারকাজে প্রবেশ করাও উদ্ধারকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের অগ্রাধিকার হবে দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন, আটকে পড়া মানুষকে শনাক্তকরণ, অগ্রাধিকারভিত্তিতে উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা। একই সঙ্গে উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন