প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের নতুন অধ্যায়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের পাশাপাশি জর্ডানও ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব লাভ করছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার মাঝে, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারকে ঘিরে জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান।
ইরান দাবি করেছে যে, জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন বাহিনী ও সামরিক সরঞ্জামকে লক্ষ্য করে এসব হামলা পরিচালিত হয়েছে। তবে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার সকালে নিক্ষেপ করা ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস বা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
হামলার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
আল-আজরাক ঘাঁটিতে কী রয়েছে?
জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, দেশটির জনবিরল পূর্বাঞ্চলীয় মরুভূমিতে অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি, যা আল-আজরাক ঘাঁটি নামেও পরিচিত।
ঘাঁটিটির নামকরণ জর্ডানের যুদ্ধবিমান চালক লেফটেন্যান্ট মুওয়াফফাক সালতির নামে করা হয়েছে।
আল-আজরাক, জর্ডান ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা। এখানে দুটি রানওয়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন ধরনের মার্কিন সামরিক বিমান ও সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়।
কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রভাষক তাহানি মুস্তাফা মন্তব্য করেছেন যে, আল-আজরাক এমন কয়েকটি ঘাঁটির মধ্যে একটি যেখানে এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-২২ যুদ্ধবিমান রাখা যায়।
তার মতে, ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে এসব হ্যাঙ্গার এবং সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদ।
কেন আল-আজরাককে লক্ষ্য করছে ইরান?
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে, আল-আজরাক ঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রস্তুতি ও মোতায়েন কেন্দ্র এবং বিমান রাখার স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় মার্কিন সামরিক স্থাপনার বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তবে ওয়াশিংটনের এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে, জর্ডানে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কোনো হতাহত হয়নি।
ইরানের দৃষ্টিতে আল-আজরাকের গুরুত্বের মূল কারণ হলো, এখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন অভিযানের কৌশলগত ভূমিকা।
জর্ডান কেন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ?
জর্ডানে প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে বলে ২০২৬ সালের মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশটির আরও কয়েকটি স্থানে মার্কিন সামরিক সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ জর্ডানের কিং ফয়সাল বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়া ও ইরাক সীমান্তের কাছাকাছি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত টাওয়ার ২২ নামের একটি সামরিক লজিস্টিক ঘাঁটি উল্লেখযোগ্য।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডান একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় মার্কিন বাহিনী ও তাদের ঠিকাদারদের জর্ডানের ১২টি সামরিক স্থাপনায় প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।
ফলে আঞ্চলিক সংঘাতের সময় জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
যুদ্ধের আগে থেকেই মার্কিন উপস্থিতি
মার্কিন সামরিক বাহিনী ২০২১ সালের চুক্তির আগে আল-আজরাক ঘাঁটিতে তাদের উপস্থিতি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, অন্তত ২০১৬ সাল থেকেই ঘাঁটিটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর ড্রোন ও দ্রুতগতির যুদ্ধবিমান অবস্থান করছিল।
২০২৩ সালে মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়া ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও পুনরুদ্ধার (আইএসআর) অভিযানে জর্ডানের বিমানঘাঁটিগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে নয়, দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে জর্ডান।
সংঘাত শুরুর পর আল-আজরাকের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের আগে থেকেই আল-আজরাক ঘাঁটির গুরুত্ব বাড়ছিল। যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ঘাঁটিটি মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব বা সরবরাহ ও সামরিক পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হয় বলে জানিয়েছেন ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের গবেষক ডেভিড শেনকার।
তার মতে, ঘাঁটিটিতে প্রায় ৬০টি যুদ্ধবিমান এবং সি-১৭ সামরিক পরিবহন বিমান ব্যবহারের সুযোগ ছিল।
জর্ডানের ভৌগোলিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করেছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর তুলনায় জর্ডান ইরান থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে। ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদকে কিছুটা বেশি কৌশলগত গভীরতা বা নিরাপদ দূরত্বে রাখার সুযোগ দেয় জর্ডান।
শেনকারের ভাষায়, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে জর্ডানের অবস্থান ‘অপরিহার্য’ হয়ে উঠেছে।
এর আগেও বহুবার হামলার দাবি ইরানের
চলমান যুদ্ধে ইরান মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১০ বারের বেশি আল-আজরাক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে। মার্চের শুরুতেই প্রথমবার ঘাঁটিটি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করে তেহরান।
এরপর ১০ জুন ইরান দাবি করে, আল-আজরাকসহ কুয়েত ও বাহরাইনের আরও কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল।
সে সময় আইআরজিসি দাবি করেছিল, তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আল-আজরাক ঘাঁটির হ্যাঙ্গার ও কমান্ড সেন্টারসহ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহেও ইরান একাধিকবার আল-আজরাক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করে এবং সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানায়।
জুলাইয়ের হামলায় মার্কিন সেনা নিহত
১৭ জুলাই ইরান দাবি করে, আল-আজরাক ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বিমান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের দাবি ছিল, এতে কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ও যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে।
পরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ওই হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত, একজন নিখোঁজ এবং আরও চারজন আহত হয়েছেন।
এর ফলে আল-আজরাক শুধু ইরানের ঘোষিত হামলার লক্ষ্য নয়, বাস্তব সামরিক সংঘাতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে সামনে আসে।
২০১৭ সালেই ঘাঁটির সম্প্রসারণে বড় বিনিয়োগ করা হয়েছে।
আল-আজরাক ঘাঁটির কৌশলগত গুরুত্ব বোঝাতে এর অবকাঠামোগত সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ সালে মার্কিন কংগ্রেস বিমানবাহিনীর অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ঘাঁটিটির সম্প্রসারণে ১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার বরাদ্দ অনুমোদন করে।
তৎকালীন সময়ে এটি ছিল ঘাঁটির জন্য সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি। মূলত বিমান ওঠানামা ও অবস্থানের জন্য রানওয়ের পাশের জায়গা বা র্যাম্প সম্প্রসারণে এই অর্থ ব্যয় করা হয়।
এছাড়া চলমান যুদ্ধের শুরুতে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে অবস্থানরত কিছু মার্কিন সেনাকেও জর্ডানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ইরানের হামলায় জর্ডান কতটা ঝুঁকিতে?
ইরান সরাসরি জর্ডানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে না। তেহরানের দাবি, তাদের লক্ষ্য জর্ডান নয়; বরং দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক বাহিনী ও সম্পদ।
তবে জর্ডানের মাটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি দেশটিকে ক্রমেই সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হামলার কারণে জর্ডানের নিজস্ব নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হতাহত না হলেও আল-আজরাককে ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই জর্ডানের মতো তুলনামূলকভাবে সরাসরি যুদ্ধে না থাকা দেশগুলোর ভূখণ্ডও বড় শক্তিগুলোর সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠছে। সূত্র: আল-জাজিরা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন