প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বরগুনা জেলা, যা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। এই জেলার নদী, খাল, পুকুর, দিঘি, বিল এবং অসংখ্য জলাশয় মাছ চাষের জন্য অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তবে, এসব জলাশয়ের একটি বড় অংশ এখনো পরিকল্পিত মাছ চাষের আওতায় আসেনি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা গেলে, এই জলাশয়গুলো প্রান্তিক জনগণের স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম অবলম্বন হতে পারে।
বিশেষ করে দরিদ্র জেলে পরিবার, ভূমিহীন মানুষ, বেকার যুবক ও নারীদের সমবায়ভিত্তিক মাছ চাষের উদ্যোগে যুক্ত করা গেলে, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মাছ চাষের সঙ্গে হাঁস পালন, পুকুরপাড়ে সবজি ও ফলদ বৃক্ষের চাষ এবং উপযোগী জলাশয়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের মাধ্যমে একই জলাশয় থেকে বহুমুখী আয় করা সম্ভব।
মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট মাছ উৎপাদনের ৫৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে চাষ থেকে আসে। ওই অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন ছিল ৫০ দশমিক ১৮ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বদ্ধ জলাশয়ে উৎপাদিত মাছের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৭৮ লাখ মেট্রিক টন। এই পরিসংখ্যান জলাশয়ভিত্তিক মাছ চাষের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে তুলে ধরে।
বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, বেতাগী ও বামনা- এই ছয়টি উপজেলায় মাছ চাষের উপযোগী বিভিন্ন জলাশয় বিদ্যমান। পানির লবণাক্ততা, গভীরতা ও পরিবেশের ভিত্তিতে কোথাও কার্প, তেলাপিয়া ও পাঙাশ, আবার কোথাও চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া উপযোগী জলাশয়ে খাঁচায় মাছ চাষ এবং মাছের সঙ্গে মুক্তা চাষের মতো বিকল্প উদ্যোগও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিয়াউদ্দিন মন্তব্য করেন, "জেলার জলাশয়গুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে মাছের উৎপাদন ও গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।" তিনি বলেন, জলাশয়ের ধরন অনুযায়ী মাছের প্রজাতি নির্বাচন, মানসম্মত পোনা, সুষম খাদ্য এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মৎস্য বিভাগের কারিগরি পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে চাষিরা উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবেন।
বরগুনা জেলা পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা জানান, তাঁর গ্রামের বাড়ি পাবনা জেলায়। সেখানে প্রান্তিক জনগণ বিভিন্ন জলাশয়ে সমন্বিতভাবে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। বরগুনায়ও অসংখ্য জলাশয় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, এসব জলাশয় মাছ চাষের আওতায় আনা গেলে প্রান্তিক জনগণের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ জন্য স্থানীয় সচেতন মহলের উচিত জলাশয়গুলোকে মাছ চাষের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া।
জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল বলেন, "জলাশয়কে ঘিরে পরিকল্পিত মৎস্য অর্থনীতি গড়ে তোলা গেলে প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।" তিনি উল্লেখ করেন, এ ক্ষেত্রে সরকারি জলাশয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অগ্রাধিকার, প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও মৎস্য চাষি জাকির হোসেন মিরাজ মনে করেন, জলাশয়ের তালিকা তৈরি, মালিকানা ও ব্যবহারযোগ্যতা যাচাই এবং উপজেলাভিত্তিক মৎস্য চাষ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, উৎপাদিত মাছের ন্যায্যমূল্য, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।
জেলে সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি বরগুনা সদর উপজেলার কালিরতব গ্রামের মো. আব্দুর রহিম মিয়া বলেন, নদী ও সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা, বৈরী আবহাওয়া কিংবা মাছের স্বল্পতার সময় জেলে পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে। স্থানীয় জলাশয়ে দলগতভাবে মাছ চাষের সুযোগ পেলে তাঁদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা হবে। এ জন্য প্রশিক্ষণ, পোনা, মাছের খাদ্য ও স্বল্পসুদে ঋণ প্রয়োজন।
তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া গ্রামের আব্বাসউদ্দিন হাওলাদার জানান, পুঁজি, উপযুক্ত জলাশয় ও কারিগরি জ্ঞানের অভাবে অনেক দরিদ্র মানুষ মাছ চাষে আগ্রহী হয়েও উদ্যোগ নিতে পারেন না। সরকারি ব্যবস্থাপনায় জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে তাঁরা উৎপাদনমুখী কাজে যুক্ত হতে পারবেন।
পাথরঘাটার মৎস্য চাষি মো. খলিলুর রহমান পহলান বলেন, মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি বিক্রির নিশ্চয়তাও প্রয়োজন। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ঢাকাসহ বড় বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং সমবায়ভিত্তিক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে পুঁজির সংকট, মাছের খাদ্যের উচ্চমূল্য, মানসম্মত পোনার অভাব, রোগবালাই, পানির লবণাক্ততা ও বাজারজাতকরণের দুর্বলতা বড় প্রতিবন্ধকতা। উপকূলীয় এলাকার ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি মাছ চাষের নামে জলাশয় দখল, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ বন্ধ কিংবা পরিবেশের ক্ষতি রোধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রথমে ছয়টি উপজেলায় সম্ভাবনাময় জলাশয়ের তালিকা ও জরিপ করে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। প্রকৃত জেলে ও দরিদ্র পরিবারকে সমবায়ের মাধ্যমে জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ, প্রশিক্ষণ, মানসম্মত পোনা, স্বল্পসুদে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদিত মাছের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
বরগুনার জলাশয়গুলো শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি হতে পারে। সুষ্ঠু পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে, এসব জলাশয় ঘিরেই সৃষ্টি হতে পারে কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বিতার নতুন দিগন্ত। এখন প্রয়োজন সম্ভাবনাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়া।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন