প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আজ সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণার আট বছর পূর্ণ হয়েছে। তবে এই ঘোষণার পরও বন ও জলদস্যুদের কার্যক্রম থেমে থাকেনি। এখনো বনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যাওয়া জেলেরা এবং বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে বিভিন্ন দস্যু বাহিনী। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে অন্তত ১১টি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীতে শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে।
সম্প্রতি কোস্ট গার্ড ও এসআরবি-৬-এর ধারাবাহিক অভিযানে জিম্মি জেলেদের উদ্ধার, বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ এবং দস্যুদের আস্তানার সন্ধান পাওয়ার ফলে সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একদিকে যেমন দস্যু দমনের অভিযান চলছে, অন্যদিকে জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং বনের সম্পদ লুটের ঘটনার মতো ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এক সময় জলদস্যু ও বনদস্যুদের আতঙ্কে সুন্দরবনে মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ কিংবা গোলপাতা কাটতে যাওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণের দাবিতে বনজীবীরা অতিষ্ঠ ছিলেন। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের কাছ থেকে ৪৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদ জমা নেওয়া হয়। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর আরো ছয়টি দস্যু বাহিনীর ৫৪ সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। ওই দিনই সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এখনও সুন্দরবন কিংবা বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা নিরাপদ হয়নি।
এখনো জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, হরিণ শিকার, বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা এবং বনজসম্পদ লুটের মতো ঘটনা ঘটছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান, দস্যুদের আত্মসমর্পণ এবং নিরাপত্তায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে দস্যুমুক্ত ঘোষণার আট বছরে সুন্দরবনের সামনে অর্জন ও সংকট—দুই বাস্তবতাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সুন্দরবনের নিরাপত্তায় কোস্ট গার্ড, এসআরবি-৬, নৌ পুলিশ ও বন বিভাগের সদস্যরা কাজ করছেন।
১১ দস্যু বাহিনীর শতাধিক সদস্য সক্রিয়
বর্তমানে সুন্দরবনে ১১টি দস্যু বাহিনীর তত্পরতা রয়েছে। বাহিনীগুলো হলো করিম শরীফ বাহিনী, কাজল মুন্না বাহিনী, দয়াল বাহিনী, ছাত্তার বাহিনী, মামা-ভাগ্নে বা সুলতান বাহিনী, মিঠু বাহিনী, বাম্বা বাহিনী, মজিদ বাহিনী, মঞ্জু বাহিনী, ভাই ভাই বাহিনী ও দাদা ভাই বাহিনী। এসব বাহিনীতে শতাধিক সক্রিয় সদস্য রয়েছেন বলে জানা গেছে।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানিয়েছেন, সুন্দরবনে সক্রিয় দস্যু বাহিনীগুলোর কার্যক্রমের ওপর নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বিশেষ অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে।
দুই বিশেষ অভিযানে ৪১ দস্যু আটক
সুন্দরবনের সব বনদস্যুর বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানিয়েছেন, সুন্দরবনের সক্রিয় বনদস্যু বাহিনী নির্মূল এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সমন্বয়ে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামের দুটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অভিযানের মূল লক্ষ্য সক্রিয় দস্যু বাহিনী নির্মূল করা এবং সাধারণ জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৪১ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ৫৯টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৫ রাউন্ড তাজা গোলা, ৩৫৯ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ১১৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগানের গোলা ও দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া দস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৫২ জন জেলে, দুই পর্যটক ও একজন রিসোর্ট মালিককে জীবিত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
৫১ দস্যুর আত্মসমর্পণ, এসআরবি-৬-এর অভিযানে ৭৪ আত্মসমর্পণ
কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানে কোণঠাসা হয়ে ছোট সুমন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী ও মজনু বাহিনীর মোট ৫১ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছেন। এ সময় তাঁরা ৪৮টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৮১ রাউন্ড তাজা কার্তুজ ও ৮৭ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ জমা দেন। অন্যদিকে এসআরবি-৬-এর তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত অভিযানের মুখে গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—এই দুই মাসে ছয়টি জলদস্যু বাহিনীর ৭৪ জন সদস্য দুই ধাপে আত্মসমর্পণ করেছেন। একই সময়ে চলা অভিযানে বিভিন্ন ধরনের ৭৩টি অস্ত্র, ৮৫২ রাউন্ড গোলাবারুদ এবং দস্যুতার কাজে ব্যবহূত অন্যান্য সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘোষণার পরও কেন ফিরছে দস্যুতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে দস্যুতা নির্মূল করা সম্ভব নয়। দস্যুদের আত্মসমর্পণের পর পুনর্বাসন, তাঁদের অপরাধে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি, দস্যুদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ, নতুন দস্যু বাহিনীর উত্থান ঠেকানো এবং অস্ত্র ও অর্থের উত্স শনাক্ত করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।
আত্মসমর্পণ করলে সহায়তা, না হলে কঠোর ব্যবস্থা
এসআরবি-৬ (খুলনা)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, দস্যু দমনে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দস্যুরা আত্মসমর্পণ করলে তাঁদের সহায়তা দেওয়ার জন্য বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। অন্যথায় অন্ধকারের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে না এলে এবং দস্যুতায় জড়িত থাকলে তাঁদের আরো কঠোর আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, বনজীবী, স্থানীয় জনগণ, বন বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বিভিন্ন সংস্থা ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই পারে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে দস্যুমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে।
তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান অভিযান, নজরদারি ও পেশাদার তৎপরতা এ লক্ষ্য অর্জনের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সুন্দরবন আরো নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ থাকবে বনের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন