প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মহররম মাসের মর্যাদা প্রমাণিত হয়েছে একাধিক হাদিসের মাধ্যমে। ইসলামী জীবন ডেস্ক থেকে প্রকাশিত এই খবর অনুযায়ী, হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম, যা সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ। মহররমুল হারাম সেই চারটি মাসের মধ্যে একটি, যার মর্যাদা আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টির সময় থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। মহান আল্লাহ বলেন যে, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস ১২টি। তার মধ্যে চারটি নিষিদ্ধ মাস, এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আশরাফ আলী থানবি (রহ.) উল্লেখ করেন, ‘আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী, তাঁর কাছে গণ্য মাসের সংখ্যা ১২টি চান্দ্রমাস। যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকেই এ ব্যবস্থা নির্ধারিত। এর মধ্যে চারটি মাস বিশেষ মর্যাদা এবং সম্মানের অধিকারী।’ (বয়ানুল কোরআন) কাতাদা (রহ.) বলেন, ‘সম্মানিত মাসগুলোতে নেককাজের সওয়াব অনেক বেশি। তাই এ মাসগুলোতে পাপকাজের শাস্তিও অধিক কঠোর। যদিও পাপ সবসময়ই বড় অপরাধ, কিন্তু এসব মাসে তা আরো গুরুতর হয়ে ওঠে।’ (তাফসিরে মাজহারি) মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) উল্লেখ করেন, ‘সব নবী-রাসুলের শরিয়ত এই বিষয়ে একমত যে এই চার মাসে ইবাদতের সওয়াব বৃদ্ধি করা হয় এবং কেউ যদি এ সময়ে গুনাহ করে, তবে তার পরিণতি ও শাস্তিও অধিক কঠোর হয়।’ (মাআরিফুল কোরআন)
মহররমের প্রথম দশক ও তার আমল সম্পর্কে আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.) বলেন, পূর্বসূরি মনীষীরা তিনটি দশকের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব ও সম্মান প্রদর্শন করতেন। তা হলো—১. রমজান মাসের শেষ দশক, ২. জিলহজ মাসের প্রথম দশক, ৩. মহররম মাসের প্রথম দশক। একাধিক হাদিস দ্বারা মহররম মাসের মর্যাদা প্রমাণিত হয়। আবুজর গিফারি (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাতের কোন অংশ সবচেয়ে উত্তম এবং কোন মাস সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ? তিনি উত্তরে বললেন, ‘রাতের মধ্যভাগ সবচেয়ে উত্তম। আর মাসগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হলো আল্লাহর মাস, যাকে তোমরা মহররম বলে ডাকো।’ (খুসুসিয়াতে মাহে মহররমুল হারাম)
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে রমজান মাসের পর মহররম মাসের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এই কারণে ইসলামের ইতিহাসে এ মাসকে ইবাদত, আত্মশুদ্ধি, নেক আমল এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মহররম শুধু ইসলামী বছরের সূচনাই নয়, বরং এটি মুসলমানদের জন্য আত্মসমালোচনা, তাকওয়া বৃদ্ধি এবং আল্লাহর প্রতি নতুন অঙ্গীকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। মহররম মাসে নফল রোজার বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। কারণ এ মাসটি আল্লাহর সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্কিত বলে গণ্য হয়েছে। আল্লাহর দিকে এই মাসের এই বিশেষ সম্বন্ধই এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় বহন করে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রমজানের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (মিশকাত, হাদিস : ২০৪৮)
ফকিহরা বলেছেন, চারটি সম্মানিত মাস (আশহুরে হুরুম)-এর মধ্যে বিশেষভাবে মহররম মাসে সামর্থ্য ও সুযোগ অনুযায়ী বেশি বেশি নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব। মহররমের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো, আশুরার রোজা। এর গুরুত্ব সম্পর্কে আবু কাতাদা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
মদিনায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখেন, ইহুদিরা আশুরার দিন রোজা রাখে। কারণ এ দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফিরআউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন নবী (সা.) বলেন, ‘মুসার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৬৮০)
মহররম মাসের কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে রয়েছে— ১. সপ্তম হিজরিতে এই মাসেই সংঘটিত হয় খায়বারের বিখ্যাত যুদ্ধ। ২. ১৪ হিজরিতে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক কাদিসিয়ার যুদ্ধ, যেখানে মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) এবং পারস্য বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন বিখ্যাত রুস্তম। তিনদিনের কঠোর যুদ্ধের পর চতুর্থ দিনে মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেন। ৩. ১৮ হিজরিতে সিরিয়া ও ইরাক অঞ্চলে ‘তাউন-ই-আমওয়াস’ নামের মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। এই মহামারিতে ইন্তেকাল করেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.), যিনি সে সময় মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ওই অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। একই বছরের মধ্যে ইয়াজিদ (রা.) ইন্তেকাল করলে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মুয়াবিয়া (রা.)-কে দামেশকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ৪. ২৪ হিজরিতে আমর ইবনুল আস (রা.) বিজয়ীর বেশে মিসরে প্রবেশ করেন। একই বছরে উসমান (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৫. ৬১ হিজরিতে মহররম মাসে নবীজি (সা.)-এর দৌহিত্র হুসাইন বিন আলী (রা.) তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে শাহাদাতের অমৃত পান করেন। ৬. ৭৪ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)।
এছাড়াও সৃষ্টির প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা এই দিনে সংঘটিত হয়েছে বলেও ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়। মহররম ও আশুরার করণীয় সম্পর্কে প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেছেন যে এই মাসে কিছু কাজ করার কথা রয়েছে। তা হলো— ১. আশুরার রোজা রাখা। ২. পরিবারের সদস্যদের জন্য ব্যয়ে কিছুটা উদারতা প্রদর্শন করা। ৩. ফরজ ইবাদতের প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া এবং নফল ইবাদত বেশি বেশি করা। ৪. গুনাহ ও অসৎ কাজ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। ৫. সুন্নতের অনুসরণ ও অনুকরণের প্রতি যত্নশীল থাকা। ৬. ধর্মের অংশ নয় এমন মনগড়া ও ভিত্তিহীন নানা সামাজিক বা ধর্মীয় রীতিনীতি থেকে বিরত থাকা।
আল্লাহ সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন