প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সরদহ সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় বর্তমানে শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যা শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধ চর্চার এক গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী। এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ও খ্যাতনামা বিদ্যালয়, যা এক শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলের শিক্ষার প্রসার, মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি এবং সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯১৬ সালে তৎকালীন সারদা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) এর অধ্যক্ষ মেজর চামনি স্থানীয় জনগণের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য সরদহ এমই জুনিয়র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যালয়টি ১৯২৭ সালে উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। ১৯২৯ সালে শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন লাভের পর, ১৯৩১ সালে বিদ্যালয়টির পাঁচ জন শিক্ষার্থী মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং সবাই উত্তীর্ণ হয়। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান আমলে ফোর্ট ফাউন্ডেশন এর উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পাইলট স্কুল হিসেবে অন্তভুক্ত করা হয়, যার মধ্যে এই বিদ্যালয়টিও ছিল। তখন থেকেই বিদ্যালয়টির নাম পাইলট অন্তভুক্ত করে সরদহ সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং রাজশাহী অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা পালন করে আসছে।
১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিদ্যালয়টিকে জাতীয়করণ করেন। এর ফলে পদ্মানদী বেষ্টিত ও অপেক্ষাকৃত অবহেলিত এই অঞ্চলের অসংখ্য ছেলেমেয়েদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়। জাতীয়করণের পর বিদ্যালয়টির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীর ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শুধু চারঘাট বা রাজশাহী নয়, বরং দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অর্জন করেছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টি অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা ও সমাজনেতা তৈরি করেছে। শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং নেতিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সাফল্য বিদ্যালয়টির সুনাম আরও বৃদ্ধি করেছে।
দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী জিনিয়া বলেন, "এত ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতে পেরে আমি গর্বিত। বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আমাদের শুধু পাঠ্যবই নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে কাজ করেন।" বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক রজব আলী বলেন, "শতবর্ষেও এই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আমরা সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করছি।"
অভিভাবক রেহেনা পারভিন বলেন, "আমার সন্তান এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে বলে আমি নিশ্চিত থাকি। শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতা বিদ্যালয়টিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।" শতবর্ষের এই গৌরবময় যাত্রায় সরদহ সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় শুধুমাত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অগ্রগতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। নতুন শতাব্দীতে পদার্পণের প্রাক্কালে বিদ্যালয়টির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শুভানুধ্যায়ীরা এর ঐতিহ্য ও সাফল্যের ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক খাতুনে রাহে নাজাত বলেন, "সরদহ সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাস আমাদের জন্য গর্বের। বিদ্যালয়টির ঐতিহ্য ও সুনাম অক্ষুণ্ন রেখে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে আমরা কাজ করছি।" তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে আগামী দিনে এই বিদ্যালয় দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, "সরদহ সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টি এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শতবর্ষের এই গৌরবময় পথচলা, শিক্ষার মান, শৃঙ্খলা ও সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।" তিনি বিশ্বাস করেন, আগামী দিনেও প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন