প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমদ শাকিল থিসিসভিত্তিক মাস্টার্স পরীক্ষায় ৪.০০-এর মধ্যে ৪.০০ সিজিপিএ অর্জন করে ডিস্টিংশন লাভ করেছেন। স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় তিনি ৪.০০-এর মধ্যে ৩.৯০ সিজিপিএ নিয়ে ১১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। শাকিল সৌরশক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নতুন কার্যকরী পদার্থ নিয়ে গবেষণায়ও অবদান রাখছেন। ইতোমধ্যে তাঁর তিনটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
একাডেমিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে স্নাতক পর্যায়ের প্রথম ও তৃতীয় বর্ষে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজিম উদ্দিন বৃত্তি লাভ করেন শাকিল। উভয় বর্ষেই প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। অনার্সে ভালো ফলাফলের জন্য ২০২৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (ডিএসএইচই) থেকে মেধাবৃত্তি পান।
শাকিলের গবেষণার আগ্রহ তৈরি হয় স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ন্যানোটেকনোলজি বিষয়ে পড়াশোনার সময়। সৌরশক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রযুক্তি এবং আরও সাশ্রয়ী ও কার্যকর সৌরকোষ তৈরির সম্ভাবনা তাঁকে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে, পেরোভস্কাইটভিত্তিক সৌরকোষের বিকল্প উপাদান নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকে তিনি হ্যালাইড ডাবল পেরোভস্কাইট নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
এ গবেষণায় তিনি কম্পিউটেশনাল কেমিস্ট্রির সাহায্যে বিভিন্ন পদার্থের রাসায়নিক গঠন, ইলেকট্রনিক বৈশিষ্ট্য ও সৌরকোষে ব্যবহারের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করেন। প্রথম-নীতিভিত্তিক গণনা ও সৌরকোষের ডিভাইস সিমুলেশন ব্যবহার করে পরিচালিত এ গবেষণায় K₂LiGaBr₆ নামের একটি পদার্থের ব্যান্ড গ্যাপ ১.১৯ ইলেকট্রনভোল্ট পাওয়া যায়। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট সৌরকোষ কাঠামোর সিমুলেশনে প্রায় ২৭ শতাংশ দক্ষতার সম্ভাবনা দেখা যায়। গবেষণাটি ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক Q1-শ্রেণিভুক্ত সাময়িকী Materials Advances-এ প্রকাশিত হয়।
এর আগে স্নাতক পর্যায়ে সৌরকোষে ব্যবহারের সম্ভাবনাময় জৈব রঞ্জক পদার্থ নিয়ে গবেষণা করেন শাকিল। ডেনসিটি ফাংশনাল থিওরি (DFT) ও টাইম-ডিপেন্ডেন্ট ডেনসিটি ফাংশনাল থিওরি (TD-DFT) ব্যবহার করে বিভিন্ন রঞ্জকের আলো শোষণ ও অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন তিনি। এ গবেষণার ফলাফল ২০২৪ সালে Chemical Physics Impact সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
কম্পিউটেশনাল গবেষণার পাশাপাশি পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণাতেও কাজ করেছেন শাকিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ল্যাবরেটরি অব অ্যাডভান্সড রিসার্চ ইন কেমিক্যাল সায়েন্সেসে (LARCS) তাঁর মাস্টার্সের থিসিস গবেষণা সম্পন্ন করেন। পিপেরোনাল ও বেনজোহাইড্রাজাইড থেকে তৈরি শিফ বেস লিগ্যান্ডের সঙ্গে টাইটানিয়াম ও ভ্যানাডিয়ামের কমপ্লেক্স সংশ্লেষণ এবং সেগুলোর রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ ছিল তাঁর গবেষণার মূল বিষয়। এ কাজে যৌগ সংশ্লেষণ, বিভিন্ন স্পেকট্রোস্কোপিক পরীক্ষা, কম্পিউটেশনাল বিশ্লেষণ ও মলিকিউলার ডকিংয়ের মতো পদ্ধতি ব্যবহার করেন তিনি। তাঁর থিসিসের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন।
শাকিলের গবেষণার পরিধি শুধু সৌরকোষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালে ChemistrySelect সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আইবুপ্রোফেনের বিভিন্ন ডেরিভেটিভের সম্ভাব্য ওষুধ হিসেবে কার্যকারিতা কম্পিউটেশনাল পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করেন তিনি। প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েডভিত্তিক সম্ভাব্য KRAS G12D ইনহিবিটর নিয়ে তাঁর আরেকটি গবেষণাপত্র পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে শাকিল মনে করেন, কম্পিউটার সিমুলেশনে কোনো পদার্থের আশাব্যঞ্জক বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেলেই তা বাস্তবে তৈরি করা সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি পরীক্ষাগারে গবেষণার ফলাফল যাচাই করাকেও গুরুত্ব দিতে চান তিনি। ভবিষ্যতে এ দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে নতুন কার্যকরী পদার্থ উদ্ভাবন এবং টেকসই জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নয়নে অবদান রাখার লক্ষ্য তাঁর।
পড়াশোনা ও গবেষণার পাশাপাশি ২০২১ সাল থেকে টিউশনি করে নিজের ব্যয় নির্বাহ করছেন শাকিল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত পড়ান তিনি। একই সঙ্গে গবেষণাগারে চারজন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীকে যৌগ সংশ্লেষণ, বিশুদ্ধকরণ, রাসায়নিক পদার্থের নিরাপদ ব্যবহার ও বিভিন্ন পরীক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে হাতে-কলমে সহায়তা দিয়েছেন।
সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত রয়েছেন শাকিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের কেমিক্যাল সোসাইটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এ সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নবীনবরণ ও বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজনে ভূমিকা রাখেন। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়াম অন ম্যাটেরিয়ালস, এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের প্রচার কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ভবিষ্যতে উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে সৌরশক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তর, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদন ও ক্যাটালাইসিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী পদার্থ নিয়ে কাজ করতে চান শাকিল। বিশেষ করে কম্পিউটেশনাল বিশ্লেষণে পাওয়া পূর্বাভাস পরীক্ষাগারে যাচাই করে আরও দক্ষ ও কার্যকর পদার্থ উদ্ভাবনের মাধ্যমে টেকসই প্রযুক্তির বিকাশে অবদান রাখাই তাঁর লক্ষ্য।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন