প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পদ্মা ও যমুনা নদীকে ঘিরে দেশের উত্তর, দক্ষিণ-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি নতুন সেতু। একটি দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, অন্যটি দ্বিতীয় যমুনা সেতু। প্রস্তাবিত ওয়াই আকৃতির নকশায় সেতু দুটি নির্মাণ করা গেলে নদী পারাপারের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি দুই পারের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষিভিত্তিক শিল্প, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, গুদাম ও পরিবহনকেন্দ্র গড়ে উঠবে। এতে সেতুসংলগ্ন অঞ্চলগুলোকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার। অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া সেতুর সম্ভাব্যতা, ব্যয় ও কারিগরি বিষয় সমীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে। দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্যও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে জাইকা, জাপান সরকার এবং চায়না হারবার কোম্পানির সঙ্গে চিঠি চালাচালি চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে বছরের শেষ দিকে সমীক্ষা শুরু হতে পারে। সম্ভাব্য করিডর হিসেবে বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ এবং গাইবান্ধার বালাসী থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের কথা বিবেচনায় রয়েছে। তবে চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট সমীক্ষার ফলের ভিত্তিতে নির্ধারণ হবে। অর্থনীতিবিদ ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পদ্মা ও যমুনাকে ঘিরে নতুন যোগাযোগ অবকাঠামোকে শুধু সেতু হিসেবে দেখলে হবে না। এগুলোকে কৃষি, শিল্প, পণ্য পরিবহন ও পর্যটনের সমন্বিত অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে পরিকল্পনা করতে হবে। সেতুর দুই পাশে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের ওপর চাপ কমবে।
ওয়াই মডেলে ছড়াবে যোগাযোগ : ওয়াই মডেলের মূল ধারণা হলো একটি কেন্দ্রীয় সংযোগ থেকে একাধিক দিকে যোগাযোগ ছড়িয়ে দেওয়া। এ ধরনের নকশায় সেতুর সঙ্গে একাধিক আঞ্চলিক সড়ক ও যোগাযোগপথ যুক্ত করার সুযোগ থাকে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া করিডর বাস্তবায়িত হলে মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনার সঙ্গে রাজধানীর বিকল্প যোগাযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য ঢাকায় আনার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলেও দ্রুত পাঠানো সম্ভব হবে। সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ করিডর হলে বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রংপুর ও দিনাজপুরের সঙ্গে জামালপুর, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের যোগাযোগ সহজ হবে। বালাসী-দেওয়ানগঞ্জ করিডর হলে গাইবান্ধা ও রংপুরের সঙ্গে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও পূর্বাঞ্চলের নতুন যোগাযোগ তৈরি হবে। এতে বগুড়া থেকে ঢাকা ও ময়মনসিংহমুখী দূরত্ব কমার পাশাপাশি সময়, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় কমবে এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারজাত করা সম্ভব হবে।
সেতুর দুই পাশে বদলে যাবে কৃষি : দুটি সেতুর বড় সম্ভাবনা কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠা। উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপুল কৃষি উৎপাদনের বিপরীতে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও দ্রুত বাজারজাতকরণের অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। নতুন সেতু ও সংযোগ সড়ক হলে কৃষিপণ্য সংগ্রহকেন্দ্র, হিমাগার, শস্য সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, প্যাকেজিং শিল্প ও পরিবহনকেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। বগুড়া, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও যশোরের পণ্য স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ ও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। আলু থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, দুধ থেকে দুগ্ধজাত পণ্য, ফল থেকে জুস ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং মাছ থেকে হিমায়িত পণ্য উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে কৃষকরাও কাঁচা পণ্যের বদলে মূল্য সংযোজনের সুবিধা পাবেন।
গড়ে উঠবে নতুন শিল্পাঞ্চল : সেতুর দুই পাশে পরিকল্পিত কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এতে ঢাকার বাইরে উৎপাদন কেন্দ্র বাড়বে, কাঁচামাল পরিবহন সহজ হবে এবং তৈরি পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে। পরিবহন সময় ও ব্যয় কমলে উৎপাদন খরচও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন শিল্প স্থাপনের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
পর্যটনের নতুন দরজা : পদ্মা ও যমুনার চর, নদীর তীর, নৌভ্রমণ, গ্রামীণ জীবন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। এর সঙ্গে বগুড়ার মহাস্থানগড়, রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের ঐতিহ্য এবং উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতিকে যুক্ত করা যেতে পারে। যোগাযোগ সহজ হলে ঢাকার পর্যটকরা এক বা দুই দিনের ভ্রমণে এসব এলাকায় যেতে পারবেন। এতে আবাসন, খাবার, নৌভ্রমণ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটবে।
পণ্য পরিবহনে বিকল্প পথ : উত্তরাঞ্চলের পণ্য পরিবহন বর্তমানে যমুনা সেতুর ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অতিরিক্ত চাপের কারণে এ পথে সমস্যা হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়ে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু এই ঝুঁকি কমাবে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর কৃষি ও শিল্পপণ্য দ্রুত রাজধানী ও উত্তরাঞ্চলে পাঠানোর বিকল্প তৈরি করবে। দুটি সেতু সড়কে রেলপথ যুক্ত করা গেলে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে নতুন পণ্য পরিবহন করিডর তৈরি হতে পারে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সমীক্ষার পর : দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ হলেও পূর্ণ প্রকল্প ব্যয় ও চূড়ান্ত নকশা এখনো নির্ধারিত হয়নি। দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য রুট নিয়েও যাচাই চলছে। তাই ওয়াই মডেলকে এখনো প্রস্তাবিত ধারণা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সমন্বিত পরিকল্পনায় দুটি সেতু বাস্তবায়িত হলে যোগাযোগের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক শিল্প, পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসাবাণিজ্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন