প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কবর খোঁড়ার কাজে প্রথম কোদাল হাতে ওঠে ছয় বছর বয়সে আবদুস সোবহান টুলুর। এরপর থেকে তিনি আর থামেননি। কবর খুঁড়তে খুঁড়তে ৮২ বছর কেটে গেছে। তিনি একে একে ১৫ হাজারেরও বেশি কবর খুঁড়েছেন। গাইবান্ধা শহরের মমিনপাড়ার বাসিন্দা আবদুস সোবহান টুলু, যিনি স্থানীয়দের কাছে ‘টুলু চাচা’ নামে পরিচিত, অগণিত মানুষের শেষ বিদায়ের সাক্ষী। জীবনের একটি বড় অংশ তিনি মানুষের শেষযাত্রার প্রস্তুতি করে কাটিয়েছেন। কখনও ভোরে, কখনও গভীর রাতে—মৃত্যুর খবর এলেই তিনি কবরস্থানে ছুটে যান। তার লক্ষ্য হলো মানুষের শেষ সম্মান নিশ্চিত করা।
১৯৪৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর আবদুস সোবহান টুলুর জন্ম। ১৯৫০ সালে মাত্র ছয় বছর বয়সে বড় ভাই ও স্থানীয়দের সঙ্গে পৌর গোরস্তানে গিয়ে প্রথম কবর খোঁড়ার কাজে হাতেখড়ি হয় তার। এরপর থেকে নিয়মিত কবর খোঁড়া ও দাফনের কাজে যুক্ত হন। পৌরসভায় অস্থায়ী গোরখোদক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করেছেন। ১৯৮৯ সালে পৌরসভায় অস্থায়ী গোরখোদক হিসেবে নিয়োগ পান। তখন তার মাসিক বেতন ছিল পাঁচ হাজার টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে নয় হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
দিন কিংবা রাত— শহরের কোথাও মৃত্যুর খবর এলেই টুলু চাচার ডাক পড়ে। যখন একটি পরিবার স্বজন হারানোর শোকে মুহ্যমান, তখন তিনি নীরবে কবর খুঁড়ে শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।
টুলু মিয়া বলেন, "কখনও ভোর হওয়ার আগেই ছুটতে হয়েছে। কখনও গভীর রাতে। নির্জন কবরস্থানে কাজ করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। দেখেছি ক্ষত-বিক্ষত লাশ। কবর থেকে আগুন বের হতে দেখেছি। জিন দেখার গল্পও শুনেছি। তবে এসবের কোনো প্রমাণ পাইনি।"
এত অল্প বেতনে এত দীর্ঘ সময় এই কাজ করে কোনো আক্ষেপ আছে কিনা— জানতে চাইলে টুলু মিয়া জানান, "তেমন আক্ষেপ নেই। মানুষের শেষ বিদায়ের কাজে থাকতে পারাটাকেই সৌভাগ্য মনে করি।" তার ভাষায়, "আল্লাহকে খুশি রাখতে পারাটাই আমার একমাত্র আরাধনা।" অভাব ছিল, এখনও আছে। কিন্তু কাজ কখনও ছাড়েননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজটি করে যেতে চান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে শাহিনুর বেগম চৌধুরীর সঙ্গে টুলু মিয়ার বিয়ে হয়। অভাবের কারণে লেখাপড়া বেশি দূর এগোয়নি। ১৯৬০ সালে জেলা শহরের পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
তাদের সংসারে সাত মেয়ে সন্তান রয়েছে। বর্তমানে চার মেয়ে জীবিত।
স্বামীর কবর খোঁড়ার কাজকে গর্বের সঙ্গে দেখেন স্ত্রী শাহিনুর বেগম। তবে বিয়ের পর বিষয়টি তার কাছে সহজ ছিল না। তিনি বলেন, "মাঝরাতে কারও মৃত্যুর খবর এলেই ঘুম থেকে উঠে চলে যেতেন। এমনও হয়েছে, ভাত খেতে বসেছি— হঠাৎ ডাক এসেছে। ভাত রেখেই চলে গেছেন। প্রথম দিকে খুব বিরক্ত লাগত। পরে বুঝেছি, এটা শুধু তার কাজ নয়, দায়িত্ব।"
স্থানীয়দের ভাষ্য, টুলু মিয়ার কাজ কেবল কবর খোঁড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় তিনি নিজ উদ্যোগে কাফনের কাপড়, বাঁশসহ দাফনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করে দেন।
৫৫ বছর বয়সী রেজাউন্নবী রাজু বলেন, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই টুলু এই কাজ করেন। তার মতো মানুষ সমাজের গর্ব।
মুনশিপাড়ার বাসিন্দা জাভেদ হোসেন বলেন, এলাকায় কেউ মারা গেলে মসজিদে ঘোষণা হলেই তাকে খবর দেওয়া হয়। তিনি কবর খোঁড়ার পাশাপাশি কাফনের কাপড়, বাঁশসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সংগ্রহ করে দেন। এমন নির্লোভ মানুষ এখন খুবই কম।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন