প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মালয়েশিয়া মুসলিম-বান্ধব পর্যটনে সহযোগিতা আরও গভীর করার জন্য তুর্কিয়ের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনা এবং ট্রানজিট ট্যুরিজমের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায়। ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টারের প্রধান কর্মকর্তা সম্প্রতি এই তথ্য জানিয়েছেন।
মোহাম্মদ ফয়সাল বিন আবু শুয়াইব খান, সেন্টারের মহাপরিচালক, বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে বলেন, "ঐতিহাসিক স্থানগুলোর সংরক্ষণ এবং সেগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তুর্কিয়ের অভিজ্ঞতা মালয়েশিয়ার জন্য দারুণ শিক্ষণীয় হতে পারে।"
তিনি উল্লেখ করেন, "ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ব্যবস্থাপনায় তুর্কিয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। যেভাবে আপনারা ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো থেকে আয় করছেন এবং একই সাথে সেগুলোর সংস্কার, যত্ন ও ব্যবস্থাপনার তহবিল সংগ্রহ করছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া বেশ ব্যয়বহুল।"
ফয়সাল আরও বলেন, "যেভাবে আপনারা ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু নিদর্শন সংরক্ষণ করে সেগুলোকে চমৎকার পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করছেন, তা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি।"
দুই দেশই বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান মুসলিম পর্যটন বাজারকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের বিশাল পর্যটন শিল্পকে সম্প্রসারিত করতে চায়। তুর্কিয়ের পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটি পর্যটন খাত থেকে ৬,৫২৩ কোটি ডলার আয় করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬.৮ শতাংশ বেশি।
২০২৫ সালে দেশটির জাদুঘর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে প্রায় ৬ কোটি ৫৯ লাখ দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছে, যা বছরভিত্তিক হিসাবে ৬.৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। অন্যদিকে, ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে মালয়েশিয়া ৪ কোটি ২২ লাখ আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীকে স্বাগত জানিয়েছে, যা আগের বছরের ৩ কোটি ৮০ লাখের চেয়ে বেশি।
'ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬' ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশটি এই খাতকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা করছে।
তুর্কিয়ের ‘ট্রানজিট ট্যুরিজম’ মডেল
ফয়সাল ইস্তাম্বুল হয়ে ভ্রমণের নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান, তুর্কিয়ের এই বিশেষ পর্যটন পদ্ধতিটি মালয়েশিয়াও গ্রহণ করতে পারে। রাশিয়ার কাজান যাওয়ার পথে ইস্তাম্বুলে প্রায় আট ঘণ্টার যাত্রাবিরতিকালে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে তাঁকে এবং তাঁর এক সহকর্মীকে ইস্তাম্বুল শহর ঘুরে দেখার একটি বিশেষ ট্যুর প্রস্তাব করা হয়।
তিনি বলেন, "তারা আমাদের বিমানবন্দর থেকে শহরে নিয়ে যায়, এরপর বসফরাস প্রণালী বরাবর ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দেখানোর জন্য একটি ক্রুজ ভ্রমণের ব্যবস্থা করে। যেখানে গোল্ডেন হর্নসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক ভবনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হয়।"
যাত্রীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল ওই প্রোগ্রামে। তিনি বলেন, "এটি দারুণ একটি উদ্যোগ ছিল। ছোট কিন্তু সুন্দর এই সৌজন্যমূলক উপহারটি আমাদের মনে আবারও সেখানে ফিরে আসার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে।"
"তারা ট্যুরটি এমনভাবে সাজিয়েছিল যা ছিল আমাদের জন্য একটি চমৎকার ‘টিজার’ বা আগাম ঝলকের মতো, যাতে আমরা পরবর্তীতে আবার ইস্তাম্বুলে আসি, দীর্ঘ সময় থাকি এবং শহরটিকে উপভোগ করি।"
ফয়সাল জানান, তিনি চান কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘ ট্রানজিটে থাকা যাত্রীদের জন্য মালয়েশিয়াও একই ধরনের মডেল তৈরি করুক।
ইস্তাম্বুলের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, "আমি চাই, কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১ ও ২ নম্বর টার্মিনাল ব্যবহারকারী ট্রানজিট পর্যটকদের জন্য আমরাও একই ব্যবস্থা করি। যাতে আমরা তাঁদের কুয়ালালামপুর শহর ঘুরিয়ে দেখাতে পারি এবং ভবিষ্যতে তারা যেন আবারও ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। তুর্কিয়ের কাছ থেকে শেখার মতো এটি খুবই আকর্ষণীয় একটি বিষয়।"
সহযোগিতা হতে পারে দ্বিপাক্ষিক
ফয়সাল জোর দিয়ে বলেন, এই সহযোগিতা কেবল মালয়েশিয়ার শেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং কাঠামোগতভাবে মুসলিম-বান্ধব পর্যটন মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে কুয়ালালামপুরের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাও তারা বিনিময় করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, "আমরা সেখান থেকে যেমন শিখতে পারি, তেমনি আমাদের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নিতে পারি। এটি দুই তরফেই দ্বিপাক্ষিকভাবে হতে পারে।"
মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত 'ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার' মূলত মুসলিম-বান্ধব পর্যটন ও আতিথেয়তার জন্য মান নির্ধারণ, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ করে থাকে। ফয়সাল বলেন, "আমাদের মূল মনোযোগ মুসলিম-বান্ধব পর্যটন ও আতিথেয়তার ওপর। আমরা মান নির্ধারণের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও গবেষণার কাজ করি।"
সংস্থাটির অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো 'মুসলিম-ফ্রেন্ডলি ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি অ্যাসুরেন্স অ্যান্ডরিকগনিশন', যা মুসলিম পর্যটকদের প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদানকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বীকৃত দিয়ে থাকে। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ৫০০টিরও বেশি ব্যবসা ও সেবা প্রতিষ্ঠান 'মুসলিম-বান্ধব' হিসেবে নিবন্ধিত, যার মধ্যে রয়েছে ৭৩টি হোটেল, ৩৯টি ট্রাভেল এজেন্সি, ১১টি স্পা সেন্টার এবং ৩৯০ জন পর্যটক গাইড।
ফয়সাল মনে করেন, মালয়েশিয়ার এই মানদণ্ড সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা তুর্কিয়ের সুপ্রতিষ্ঠিত পর্যটন অবকাঠামোকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। তিনি বলেন, "আমাদের একটি স্বীকৃত মুসলিম-বান্ধব সনদ রয়েছে। এর ফলে তুর্কিয়ে সফরকারী পর্যটকেরা সহজেই নিশ্চিত হতে পারবেন যে তাঁরা কোনো বিশ্বস্ত ও মুসলিম-বান্ধব হোটেলে অবস্থান করছেন।"
তুর্কিয়েতে এমনিতেই সমৃদ্ধ ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, হালাল খাবার, মসজিদ এবং মুসলিম পর্যটকদের উপযোগী সুবিধার দরুন একটি বিশাল মুসলিম-বান্ধব পর্যটন বাজার রয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, "তুর্কিয়ের রয়েছে সমৃদ্ধ মুসলিম ও ইসলামিক ইতিহাস। ফলে তাদের জন্য এই কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়া এবং একই সঙ্গে মুসলিম-বান্ধব বাজারটিতে সহজে প্রবেশ করা খুবই সহজ হবে।"
মুসলিম বিশ্বের বাইরেও সুযোগ সম্প্রসারণ
সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মালয়েশিয়া ৯৭ লাখ মুসলিম দর্শনার্থীকে স্বাগত জানিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১ কোটি ৫২ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার এই স্বীকৃতি কাঠামোটি আন্তর্জাতিকভাবেও বিস্তৃত হচ্ছে। রাশিয়া, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ব্রাজিলের মতো বাজারগুলোতে এই সংক্রান্ত সহযোগিতা বাড়াচ্ছে সেন্টারটি।
ফয়সাল জানান, অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে এই মানদণ্ড বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে, কারণ সেখানে ভ্রমণকারীদের জন্য উপযুক্ত হোটেল, রেস্তোরাঁ ও সেবা খুঁজে পাওয়া তুলনামূলক কঠিন হয়। তিনি বলেন, "অ-মুসলিম দেশগুলোর ক্ষেত্রে আমরা স্থানীয় হালাল সনদ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করি। তারা বর্তমানে হালাল খাবারের সনদ দেয়, আমরা তার সঙ্গে 'মুসলিম-বান্ধব নিশ্চয়তা স্বীকৃতি' পণ্যটি যুক্ত করি। এর ফলে তারা হালাল রেস্তোরাঁর পাশাপাশি নানা ধরণের হোটেলের সুযোগও দিতে পারে। একটি মাত্র সেবার বদলে হোটেলগুলোর জন্য তারা মুসলিম-বান্ধব নিশ্চয়তা যুক্ত করতে পারছে।"
"যেসব পর্যটক এই অ-মুসলিম দেশগুলোতে যাবেন, তাঁরা স্বস্তিতে থাকতে পারবেন কারণ তারা নির্দিষ্ট কিছু নির্ভরযোগ্য সেবা পাচ্ছেন। আমরা তাঁদের চাহিদামতো সুবিধা নিশ্চিত করি," যোগ করেন ফয়সাল।
ফয়সাল বিশ্বাস করেন, তুর্কিয়ে ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ভ্রমণকারীদের দুটি দেশকেই একসঙ্গে ঘুরে দেখার ব্যাপারে উৎসাহিত করবে। তিনি বলেন, "এটি দ্বি-মুখী হতে পারে। ভ্রমণকারীরা তুর্কিয়ে ঘুরে তারপর মালয়েশিয়া আসতে পারেন, অথবা মালয়েশিয়া থেকে কোনো তৃতীয় দেশে যাওয়ার পথে তুর্কিয়েতে কিছুদিন অবস্থান করতে পারেন।"
"আমাদের লক্ষ্য একটাই, আর বাজারও একই। তাই নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় না নেমে আমরা একসাথে বেড়ে উঠতে পারি," বলেন তিনি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন