প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চট্টগ্রামের শিল্পপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জাপানি সরকারি নথি, ব্যাংকিং কাগজপত্র, আলোকচিত্র এবং সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯২ সালে যুক্তরাজ্যে জাপানি নাগরিক মিনাকো কাওয়ারাজাকিকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, গণপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। বাংলাদেশে প্রকাশিত বিভিন্ন জীবনীতে তাঁর স্ত্রী হিসেবে চট্টগ্রামের শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কন্যা নূর নাহার জামানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁদের তিন ছেলে ও তিন মেয়ের কথা বলা হলেও জাপানি পরিবারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডেইলি ওয়াদার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পর্যালোচনা করা জাপানি নথি অনুযায়ী, ১৯৯২ সালের ২১ আগস্ট যুক্তরাজ্যে আখতারুজ্জামান চৌধুরী ও মিনাকো কাওয়ারাজাকির বিয়ে সম্পন্ন হয়। ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ ঢাকায় জাপানি দূতাবাস থেকে দেওয়া একটি বিবাহ সনদে এই তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। সনদটি জাপানের কানাগাওয়া প্রিফেকচারের চিগাসাকি শহরের সরকারি পারিবারিক নিবন্ধনের সত্যায়িত কপির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
জাপানি নথিতে আখতারুজ্জামানের জন্মতারিখ ১৯৪৫ সালের ৩ মে উল্লেখ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে প্রকাশিত বিভিন্ন জীবনীতে তাঁর জন্মতারিখ ১ মে ১৯৪৫ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে প্রকাশিত নথিতে পার্থক্য রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, তাঁদের জ্যেষ্ঠ কন্যা নীনা কাওয়ারাজাকি ১৯৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল হংকংয়ে জাপানের কনস্যুলেট-জেনারেল থেকে দেওয়া জন্মসনদে তাঁর বাবা হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী এবং মা হিসেবে মিনাকো কাওয়ারাজাকির নাম উল্লেখ রয়েছে। মিনাকো তাঁদের দুই কন্যাসন্তান থাকার কথা নিশ্চিত করলেও তাঁদের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি।
প্রতিবেদনে প্রকাশিত একটি ছবিতে আখতারুজ্জামানকে মিনাকো ও দুই শিশুর সঙ্গে একটি হোটেলের বাইরে দেখা যায়। ছবিতে থাকা নারীকে মিনাকো হিসেবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে বলে ডেইলি ওয়াদা জানিয়েছে।
সম্প্রতি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের একটি নথির মাধ্যমে এই পরিবারের তথ্য নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নীনা কাওয়ারাজাকি (জামান চৌধুরী) ইউসিবির গুলশান করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপকের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে জানান, ২০১২ সাল থেকে তাঁর প্রয়াত বাবা আখতারুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর নামে একটি স্থায়ী আমানত রয়েছে। তিনি ওই আমানত ভাঙিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন।
বাংলাদেশে না থাকায় তাঁর পক্ষে অর্থ গ্রহণের জন্য মা মিনাকো কাওয়ারাজাকিকে অনুমতি দেওয়ার কথাও চিঠিতে উল্লেখ করেন নীনা। চিঠিতে ২৩ সেপ্টেম্বর ইউসিবির প্রাপ্তি সিল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ডেইলি ওয়াদা পর্যালোচনা করা ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির একটি ইউসিবি স্থায়ী আমানতের রসিদেও আখতারুজ্জামান চৌধুরী ও নীনা কাওয়ারাজাকির নাম রয়েছে। ওই আমানতের পরিমাণ ছিল ১ কোটি টাকা এবং তিন মাস মেয়াদি আমানতের বার্ষিক সুদের হার ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালের ওই রসিদের হিসাব নম্বরটি নীনার ২০২৬ সালের আবেদনে উল্লেখ করা হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে আমানতটির বর্তমান স্থিতি, পরবর্তী সময়ে এটি নিয়মিত নবায়ন করা হয়েছিল কি না, মাঝখানে কোনো অর্থ তোলা হয়েছিল কি না কিংবা নীনার আবেদনের বিষয়ে ইউসিবি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
মিনাকো ডেইলি ওয়াদাকে জানান, বাংলাদেশে আখতারুজ্জামানের আরেকটি পরিবার থাকার বিষয়টি তিনি পরে জানতে পারেন। তবে দুই পরিবারের জীবন কখনো একীভূত হয়নি বলেও জানান তিনি। কীভাবে তাঁদের পরিচয় হয়েছিল বা কী পরিস্থিতিতে বিয়ে হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি মিনাকো।
আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ব্যবসায়িক জীবনের সঙ্গে ইউসিবি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তবে ব্যাংকটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক ও আইনি অভিযোগও ওঠে। ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠানের নেওয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেয়।
১৯৯৩ সালের এপ্রিলে ইউসিবির পরিচালক হুমায়ুন জহির ঢাকার ধানমন্ডিতে নিজ বাসভবনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। ওই হত্যা মামলায় আখতারুজ্জামানসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগকে আদালতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
১৯৯৯ সালে ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদের একটি সভায় আখতারুজ্জামানের পরিবারের সদস্য ও সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলার অভিযোগ ওঠে। পরিচালকদের পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই পর্ষদ ভেঙে দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২০১০ সালে আখতারুজ্জামান আবার ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদে ফিরে আসেন।
আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে করা স্থায়ী আমানতের রসিদে নীনার নাম থাকার বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করেন তাঁর ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ। তিনি চট্টগ্রামের একটি আসনের সংসদ সদস্য এবং পরবর্তীতে ভূমিমন্ত্রী ছিলেন।
সাইফুজ্জামানের বিদেশি সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে তদন্ত ও অনুসন্ধান হয়েছে। ২০২৪ সালে আল জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তাঁর যুক্তরাজ্যসহ বিদেশে বিপুল সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়। সাইফুজ্জামান এসব সম্পত্তি বৈধ বিদেশি ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থে কেনা হয়েছে বলে দাবি করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একটি আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পর সাইফুজ্জামানের যুক্তরাজ্যে থাকা ৫১৮টি সম্পত্তি জব্দের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, এসব সম্পত্তির মূল্য প্রায় ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড। বিষয়টি অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্তের অংশ। এসব অভিযোগের এখনো বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।
মিনাকো জানান, আখতারুজ্জামানের বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে তাঁর কখনো দেখা হয়নি। তাঁর দুই মেয়ের সঙ্গেও ওই পরিবারের কোনো সদস্যের যোগাযোগ ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। জাপানি পরিবারটি সাইফুজ্জামানের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিল—এমন তথ্য কিছু সূত্র ডেইলি ওয়াদাকে দিলেও মিনাকো তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
আখতারুজ্জামানের মৃত্যুর খবরও তিনি পরিবারের কাছ থেকে নয়, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন বলে জানান। তাঁর দুই মেয়ে বাবার সম্পত্তিতে কোনো অংশ পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে মিনাকো বলেন, তাঁরা কিছু পাননি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি তিনি।
নীনার সাম্প্রতিক ইউসিবি-যোগাযোগের উদ্দেশ্য এবং স্থায়ী আমানতের বিষয়ে মিনাকো মন্তব্য করতে চাননি। একইভাবে আমানতের বর্তমান অবস্থা বা নীনার আবেদনের বিষয়ে ব্যাংকের সিদ্ধান্তও প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা যায়নি। তথ্যসূত্র: ডেইলি ওয়াদা
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন