প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গত শতকের আশির দশকের প্রথম দিকে গ্রামাঞ্চলে কাজ করার সময় দেখা গেছে, কৃষকরা সাধারণত নিজেদের বাড়িতে একটি-দুটি গরু-গাভি পালন করতেন। দেশি গাভির মাধ্যমে দিনে সর্বোচ্চ দেড়-দুই লিটার দুধ পাওয়া যেত। কৃষকরা এই দুধ নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি গ্রামের বাজারে বিক্রি করতেন। ধানের খড় ও মাঠের ঘাস খাইয়ে দু-একটি গরু লালন-পালনে খুব বেশি খরচ হত না। পরে বিদেশি জাতের উন্নত গাভি লালনের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করা হয়। বেশি দুধ পাওয়ার আশায় কৃষকরা সেই গাভি পালন শুরু করেন। কিন্তু উন্নত জাতের গাভির খাবারের খরচ বেশি হওয়ায়, নিজের পরিবারের খাবার জোগাতে হিমশিম খেতে হয় কৃষকদের। গাভির খাবার জোগাতে যখন তারা কষ্ট পেতে শুরু করেন, তখন ১৫ থেকে ২০ লিটার দুধ নিয়ে বাজারে গিয়ে ন্যায্য দাম না পেয়ে অভিমানে কৃষকরা দুধ ফেলে দেন। এর ফলে দেশের দুগ্ধ খাত প্রত্যাশিতভাবে বিকশিত হয়নি। তবে উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ সুপরিকল্পিতভাবে দুগ্ধ খাতে সফলতা অর্জন করেছে।
২০১৫ সালে নেদারল্যান্ডসের ডো মার্কে গরুর খামারে গিয়ে আমি অত্যন্ত অবাক হয়েছিলাম। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে মনে হয়েছিল, আমি গরুর খামার নয়, বরং কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এসেছি। ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) কৃষিতে যে বৈপ্লবিক রূপান্তর আনছে, তা ছিল স্মার্ট প্রযুক্তির উদাহরণ। বর্তমান সময়ে স্মার্ট মানে হলো ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকা। মুহূর্তে সব তথ্য হাতের মুঠোয়। চলতি শতাব্দীতে আমরা স্মার্ট যুগে প্রবেশ করেছি। নেদারল্যান্ডসের গরুর খামারটিও ছিল একটি স্মার্ট খামার। গরুর খাদ্য দেওয়া থেকে শুরু করে দুধ সংগ্রহ পর্যন্ত সবকিছু যান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। ডো মার্কের দুধ দোয়ানোর আধুনিক পদ্ধতি চমকপ্রদ। সেখানে গাভি যখন উপলব্ধি করে যে তার দুধ দেওয়ার সময় হয়েছে, তখন সে লাইন ধরে দুধ দোয়ানোর কেন্দ্রে উপস্থিত হয়। গাভির উপলব্ধি দিয়ে যন্ত্র সন্তুষ্ট হয় না, যন্ত্র যখন তার হিসাব দিয়ে বুঝতে পারে যে গাভি প্রস্তুত—তখনই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুধ দোয়ানো শুরু করে।
১০০ গরুর মাঝে কোনো নির্দিষ্ট গরুকে চেহারা দেখে আলাদা করা সম্ভব নয়। আমাদের কাছে সব গরুই দেখতে একই রকম। চোখে দেখে শুধু রং ও আকারের পার্থক্য করা যায়। কিন্তু আধুনিক যন্ত্র মুখে ক্যামেরা ধরে গরুর নম্বর, শারীরিক অবস্থা এবং খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ জানাতে পারে। বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এবং আইওটি উৎপাদন ব্যবস্থাকে নিয়ে যাচ্ছে অবিশ্বাস্য এক প্রান্তে, যা কিছুদিন আগেও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ছিল, আজ তা বাস্তব। একজনের পক্ষে একটি বিশাল খামার পরিচালনা করা কঠিন কাজ নয়।
২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার চুংনাম প্রদেশের থম্বক গ্রামের খামারি কিমের খামারে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কিম একাই দুই শতাধিক গরুর একটি খামার পরিচালনা করছিলেন। অফিসকক্ষে বসে কম্পিউটারে সব নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। গরুর খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে দুধ দোয়ানো ও দুধ প্রক্রিয়াকরণ হচ্ছিল অটোমেটিক যন্ত্রের সাহায্যে। চলতি বছর এপ্রিলে নেদারল্যান্ডসের ফ্রেইডোপিল এলাকায় আরেকটি ডেইরি ফার্ম দেখার সুযোগ হয়েছিল। এক হাজার ১০০ হেক্টর জমির ওপর বিশাল এক খামার। খামারে দুই হাজার ৬০০টি গাভি রয়েছে। প্রতিটি গাভি বছরে ১১ হাজার লিটার দুধ দেয়। অথচ খামারটিতে মাত্র দুজন কর্মী রয়েছে। গাভির গোসল, খাবার দেওয়া, দুধ দোয়ানো সবই করছে যন্ত্র। উৎপাদিত দুধ চিলিং হয়ে অটোমেটিক প্যাকেটজাত হয়ে যাচ্ছে। দেখে বিস্মিত হতে হয়!
আমাদের দেশে স্মার্ট গরুর খামার গড়ে উঠতে শুরু করেছে। নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চনে ব্যবসায়ী এম এ সবুর তাঁর খামারটি স্মার্ট গরুর খামার ব্যবস্থাপনায় নিয়ে এসেছেন। এই ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি গরুর জন্য একটি করে চিপ থাকে। চিপটি গলার কলারে বা কানে যুক্ত থাকে, যা গরুর শারীরিক ও পারিপার্শ্বিক সব তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম। যেমন—গরুর দেহের তাপমাত্রা, রক্ত সঞ্চালন, জাবর কাটা এবং প্রজনন সময়ের নির্ভুল তথ্য দেয়। মাতৃ গরুর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে অসময়ে গর্ভপাত রোধ করতে সাহায্য করে। গরুর কী ধরনের পুষ্টির প্রয়োজন, কী পরিমাণ আলো-বাতাস লাগবে, এমনকি গাভির দুধ দেওয়ার সময় সম্পর্কে তথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত বেইস স্টেশন থেকে সরাসরি খামারির মোবাইল ফোনে চলে আসে। জানি না কী কারণে গ্রামীণ ফোনের ডিজি কাউ আর অগ্রসর হতে পারেননি। তবে আদর্শ প্রাণিসেবা লিমিটেডের ফিদা হক তাঁর বোলাস কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কদিন আগে আশুলিয়ায় একটি খামারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেখেছি। ডাচ ডেইরি বা আমেরিকান ডেইরির কথা অনেকে হয়তো জানেন। তারা আধুনিক প্রযুক্তির বিশাল খামার গড়ে তুলেছে।
বাণিজ্যিক কৃষি মানে প্রযুক্তির কৃষি। আর প্রযুক্তির কৃষি মানে বড় বিনিয়োগের কৃষি। একজন ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে এককভাবে বাণিজ্যিক কৃষিতে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে সম্মিলিতভাবে বিনিয়োগ করা কঠিন কিছু নয়। অনেক শিল্পোদ্যোক্তা বাণিজ্যিক কৃষিতে অগ্রসর হচ্ছেন। আগেই বলেছি, আমাদের দেশে দুগ্ধ খাতে বাজার রয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক করে সুপরিকল্পিত নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এখনই আগামীর পথে হাঁটার সময়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন