প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফুরুস বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় আলংকারিক ফুলগাছ হিসেবে পরিচিত। গ্রীষ্মকাল থেকে শুরু করে শরৎকালের শেষ পর্যন্ত এই ফুল ফুটে প্রকৃতিকে রাঙিয়ে তোলে। এর চমৎকার পুষ্পমঞ্জরি, আকর্ষণীয় পাপড়ির গঠন এবং দৃষ্টিনন্দন কাণ্ড উদ্যান কিংবা পথের ধারে এক অনন্য রূপ সৃষ্টি করে। বৈজ্ঞানিক নাম Lagerstroemia indica এবং এটি Lythraceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। ইংরেজিতে একে সাধারণত Crape Myrtle বলা হয়। চলতি বছরের ২৪ জুন নরসিংদী সরকারি কলেজের ক্যাম্পাসে ফুলের ছবিটি তুলেছিলাম।
ফুরুস একটি মাঝারি আকারের পাতাঝরা গুল্ম বা ছোট বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত এটি তিন থেকে ছয় মিটার (১০ থেকে ২০ ফুট) পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর শাখা-প্রশাখা ঘন এবং চারদিকে ছড়ানো থাকে। ফুরুস গাছের অন্যতম আকর্ষণ হলো এর মসৃণ ও দৃষ্টিনন্দন কাণ্ড। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছের ছাল বা বাকল পাতলা স্তরে উঠে যায়, ফলে কাণ্ডের গায়ে ধূসর, বাদামি ও গোলাপি রঙের মসৃণ এক মিশ্র আভা তৈরি হয়। এর পাতাগুলো সাধারণত ছোট, ডিম্বাকৃতি বা আয়তকার এবং মসৃণ। বসন্ত ও গ্রীষ্মে পাতাগুলো গাঢ় সবুজ থাকে, তবে শীতের শুরুতে ঝরে পড়ার আগে পাতাগুলো তামাটে বা লালচে-হলুদ রং ধারণ করে।
ফুরুসের ফুল গ্রীষ্মকাল থেকে শরৎকালের শেষ পর্যন্ত ফুটতে থাকে। শাখার ডগায় গুচ্ছাকারে প্রচুর ফুল ফুটে। এর পুষ্পবিন্যাস প্যানিকল। পাপড়িগুলো পাতলা, কোঁচকানো এবং দেখতে ক্রেপ পেপারের (Crepe paper) মতো, যার কারণে এর নাম ক্রেপ মার্টল। ফুরুসের ফুলের রঙে বৈচিত্র্য রয়েছে। গোলাপি, বেগুনি, লাল, সাদা এবং জাম রঙের ফুল সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ফুল ঝরে যাওয়ার পর গাঢ় বাদামি রঙের ছোট ছোট গোলাকার ফল বা ক্যাপসুল তৈরি হয়। ফলের ভেতরে ডানাযুক্ত ছোট বীজ থাকে।
পার্ক, বাড়ির বাগান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাস্তার বিভাজক সাজাতে ফুরুস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। খরা ও অতিরিক্ত তাপ সহ্য করার ক্ষমতার কারণে নগর সৌন্দর্যায়ন ও ল্যান্ডস্কেপিংয়ে এর তুলনা নেই। ফুরুস ফুল মৌমাছি, প্রজাপতি এবং অন্যান্য পরাগায়ণকারী পতঙ্গকে প্রচুর পরিমাণে আকর্ষণ করে, যা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে। ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসায় ফুরুসের ছাল, পাতা ও মূলের সীমিত ব্যবহার রয়েছে। এর ছাল ও পাতায় উচ্চমাত্রায় ট্যানিন এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান থাকে, যা প্রদাহবিরোধী ও জীবাণুনাশক হিসেবে গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
গাছটি তুলনামূলকভাবে রোগবালাইমুক্ত এবং খুব বেশি যত্নের প্রয়োজন হয় না। রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশ ও সুনিষ্কাশিত মাটিতে এটি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কাটিং বা অঙ্গজ প্রজননের মাধ্যমে এর চারা তৈরি করা খুব সহজ, যা নার্সারি ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। এছাড়া বায়ুদূষণ সহ্য করতে পারায় শিল্পাঞ্চলেও এটি বেশ উপযোগী। ফুরুস শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং তপ্ত গ্রীষ্মে প্রকৃতিকে এনে দেয় স্নিগ্ধতা ও সতেজতার পরশ। উদ্যানপ্রেমীদের কাছে ফুরুসের কদর চিরন্তন।
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন