প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রের বিপুল সম্পদ দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে নতুন করে আশার আলো দেখা গেছে। নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে, জামালগঞ্জে কয়লার মজুত প্রায় ৫৫০ কোটি টনে দাঁড়িয়েছে, যা আগের হিসাবের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
১৯৬২ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রটি আবিষ্কৃত হয়। পূর্বে এখানে প্রায় ১০০ কোটি টন কয়লা থাকার হিসাব ছিল। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই কয়লাক্ষেত্রের বিস্তৃতি প্রায় ৬৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ১৪টি কূপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই নতুন মজুদের হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। একাধিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, খনির বিভিন্ন স্থানে কয়লাস্তরের পুরুত্ব প্রায় ৪৪ মিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
যদিও জামালগঞ্জে কয়লার বিশাল মজুদ রয়েছে, তবে এর উত্তোলনের প্রধান বাধা হচ্ছে এর ভূগর্ভস্থ অবস্থান। অন্যান্য কয়লাক্ষেত্রের কয়লা স্তর সাধারণত ১৫০ থেকে ৫০০ মিটার গভীরতার মধ্যে অবস্থিত, কিন্তু জামালগঞ্জের কয়লা ৬৪০ থেকে ১,১৫৮ মিটার গভীরে রয়েছে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে খনি নির্মাণ করে কয়লা উত্তোলন করতে গেলে উৎপাদন ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এই কারণে দীর্ঘদিন ধরে খনিটিকে অকেজো রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত খনি খননের চিন্তায় আটকে না থেকে আধুনিক প্রযুক্তির দিকে নজর দেওয়া উচিত। এখানে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে 'আন্ডারগ্রাউন্ড কোল গ্যাসিফিকেশন' বা ইউসিজি (Underground Coal Gasification)।
ইউসিজি প্রযুক্তিতে ভূগর্ভের কয়লা সরাসরি ওপরে না তুলে খনির ভেতরেই নিয়ন্ত্রিত উপায়ে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। পরে উৎপাদিত গ্যাসকে পরিশোধন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার জ্বালানি বা অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। বাংলাদেশের পাঁচটি কয়লাক্ষেত্রের ওপর পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জামালগঞ্জকে ইউসিজি বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সম্ভাব্যতা সূচক ৯৩.৬ শতাংশ।
জামালগঞ্জে সম্প্রতি 'কোল বেড মিথেন' বা সিবিএম (Coal Bed Methane) আহরণের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তিনটি কূপ খনন করে কয়লাস্তরের গ্যাসের পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্যাবলি পরীক্ষা করা হয়। দুটি কূপের প্রাথমিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাণিজ্যিকভাবে আহরণযোগ্য মিথেন গ্যাসের সম্ভাবনা কিছুটা কম। তবে তৃতীয় কূপটির মূল্যায়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পরবর্তী কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, সিবিএমের সম্ভাবনা কম হলেও জামালগঞ্জের কয়লা অর্থনৈতিকভাবে মূল্যহীন হয়ে যায় না। ইউসিজি প্রযুক্তির গুরুত্ব এখানেই বৃদ্ধি পায়। কারণ ইউসিজিতে কয়লা স্তর থেকে পৃথকভাবে মিথেন তুলে আনার বদলে পুরো ভূগর্ভস্থ কয়লাকেই জ্বালানি গ্যাসে রূপান্তর করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে প্রচণ্ড জ্বালানি সংকট এবং আমদানিনির্ভরতার চাপে রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিপিং ডেটা ট্র্যাকার 'Kpler'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে কয়লা আমদানি প্রায় ১৭.৩৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে কয়লা আমদানির পরিমাণ বেড়ে ২০.৭ মিলিয়ন টন হয়েছে। ফলে কয়লা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে জামালগঞ্জের বিশাল কয়লা সম্পদকে প্রযুক্তিগতভাবে কাজে লাগাতে পারলে বিদ্যুৎ খাতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
তবে একটি টেকনিক্যাল সতর্কতা জরুরি- ৫৫০ কোটি টনকে সরাসরি উত্তোলনযোগ্য বা তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহারযোগ্য মজুদ বলা যাবে না। এটি বর্তমানে 'Resource' বা ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদের মোট হিসাব। কতটুকু বাস্তবে ইউসিজি বা অন্য কোনো প্রযুক্তিতে ব্যবহারযোগ্য, কত খরচে গ্যাস উৎপাদন সম্ভব এবং উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত পড়বে- তা নির্ধারণে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (Feasibility Study) চালানো প্রয়োজন।
২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ যে ২০.৭ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করেছে, তার বড় অংশই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়েছে। দেশের বড় ৬টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মোট কয়লা আমদানির প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যবহার করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কয়লা আমদানির জন্য খোলা লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি-র (LC) মূল্য ছিল প্রায় ১.১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন (১৪,৫০০ কোটি) টাকা।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে নিজস্ব উৎস থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উল্লেখযোগ্য পরিমাণের কয়লা বা বিকল্প গ্যাস সরবরাহ করতে পারে, তবে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
জামালগঞ্জের সবচেয়ে বড় আর্থিক মূল্য শুধু কয়লা বিক্রি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের সামগ্রিক 'জ্বালানি নিরাপত্তা' নিশ্চিত করতে এর ভূমিকা অপরিসীম। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম বাড়লে দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এছাড়া সমুদ্রপথে জাহাজ ভাড়া, বন্দর পরিচালনা খরচ, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আমদানি ব্যয়কে সরাসরি প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভয়াবহ অস্থিরতা সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করেছে।
দেশের ভূগর্ভস্থ সম্পদ প্রযুক্তির মাধ্যমে সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গে একটি বড় অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে উঠলে তা স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যাপক কর্মসংস্থান, পরিবহন ও শিল্পায়নে বড় প্রভাব ফেলবে।
জামালগঞ্জ নিয়ে এখন প্রধান প্রয়োজন রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়ে বাস্তবমুখী বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা চালানো।
প্রথমত, আধুনিক ৩ডি (3D) ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং পর্যাপ্ত অনুসন্ধান কূপ খননের মাধ্যমে মজুদের পরিমাণ শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। এরপর একটি পাইলট ইউসিজি (UCG Pilot Project) প্রকল্প পরিচালনা করে দেখতে হবে-কত টন কয়লা থেকে কত ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে, সেই গ্যাসের মান কেমন, পরিবেশগত প্রভাব কতটুকু এবং প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ কত।
একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি, জমি, বাতাস ও কার্বন নিঃসরণের ওপর প্রভাব নিয়ে কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়ন (EIA) প্রয়োজন। কারণ কোনো জ্বালানি প্রকল্পের সফলতা শুধু কয়লার পরিমাণ বা মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে না, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং উৎপাদিত জ্বালানির প্রকৃত মূল্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জামালগঞ্জের সামনে এখন মূল প্রশ্ন-বাংলাদেশ কি ৫৫০ কোটি টনের সম্ভাব্য এই বিশাল সম্পদকে অপ্রচলিত বা অনুপযোগী খনি হিসেবে ফেলে রাখবে, নাকি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূগর্ভেই গ্যাসে রূপান্তর করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে?
সিবিএমের সাম্প্রতিক ফলাফলে কিছুটা সীমাবদ্ধতা এলেও ইউসিজি গবেষণার ফলাফল জামালগঞ্জকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ২০২৬ অর্থবছরে আমদানিকৃত কয়লার পরিমাণ যখন ২০.৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে, তখন নিজস্ব কয়লা ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে।
জামালগঞ্জের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত রূপরেখা হবে-প্রথমে পরীক্ষামূলক ইউসিজি (UCG) প্রকল্প, তারপর সঠিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, এবং সবশেষে বাণিজ্যিক উৎপাদনের সিদ্ধান্ত। এটি সফল হলে কয়লা আমদানির বহুমাত্রিক চাপ কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে দেশীয় জ্বালানির অংশ বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে।
জামালগঞ্জ শুধু জয়পুরহাটের একটি কয়লাক্ষেত্র নয়, সঠিক প্রযুক্তি ও সময়োপযোগী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার এক মজবুত চাবিকাঠি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন