প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের বাজার এখন নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধে সয়লাব হয়ে আছে। গ্যাস্ট্রিক, ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক এবং ডায়াবেটিসের ওষুধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাদ্য সম্পূরক ও হারবাল পণ্য কিনে বিপদে পড়ছে মানুষ।
এছাড়া সমাজমাধ্যমে অনুমোদনহীন ওষুধ ও স্বাস্থ্যপণ্য বিক্রির প্রবণতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব ভেজাল ওষুধ সেবনের ফলে রোগ সারার পরিবর্তে জটিলতা বাড়ছে এবং তৈরি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সবার চোখের সামনে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে এসব প্রতারণা চললেও ঔষধ প্রশাসন কার্যত নীরব রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, বাজারে নকল ওষুধের বিস্তার রোধে আইন থাকলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই ঔষধ প্রশাসনের।
চিকিৎসকরা স্বীকার করেছেন যে রোগীরা নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পরেও তাদের প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। পরে দেখা যাচ্ছে, ব্যবহৃত ওষুধটি নকল বা নিম্নমানের ছিল। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে জীবাণুর ওষুধ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তোলে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অসাধু চক্র নামি কোম্পানির ওষুধের মোড়ক ও ডিজাইন হুবহু নকল করে বাজারজাত করছে। যদিও ওষুধের বাজার ক্রমাগত বড় হচ্ছে তবে সে অনুপাতে পরিদর্শক, পরীক্ষাগার এবং নজরদারি ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক ফার্মেসি ও বিক্রয়কেন্দ্র নিয়মিত তদারকির বাইরে থাকে। সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতি দিন ২৪ ঘণ্টা অসংখ্য চটকদার ভিডিও বিজ্ঞাপন চলছে। এসব বিজ্ঞাপনে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত ওজন কমানো, যৌনশক্তি বৃদ্ধি, কিডনি ও লিভারের রোগ নিরাময়সহ নানা ধরনের অবাস্তব দাবি করা হয়।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পণ্যের অধিকাংশই বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা স্পষ্ট থাকেনা এবং কিছু পণ্যের কোনো সরকারি নিবন্ধন বা অনুমোদন নেই। তবু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহজেই এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
রাজধানীর কয়েকজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেখে ওজন কমানোর ওষুধ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের কথিত হারবাল পণ্য কিনে খাওয়ার পর তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। কিন্তু পরে বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। দেশে ওষুধ উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয়ের নিয়ন্ত্রণে 'ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩' কার্যকর রয়েছে। আইনে নকল, ভেজাল বা অনুমোদনহীন ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ওষুধের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন এবং বাজার তদারকির দায়িত্ব পালন করে।
ভোক্তা অধিকার কর্মীরা বলছেন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ পাচ্ছেন। বাজারে অভিযান পরিচালনা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। দেশের বিপুলসংখ্যক ফার্মেসি, অনলাইন বিক্রয় চ্যানেল এবং সরবরাহ ব্যবস্থার তুলনায় তদারকি সক্ষমতা এখনো সীমিত। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, নকল বা ভেজাল ওষুধে প্রয়োজনীয় কার্যকর উপাদান না থাকলে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান মেশানো থাকায় কিডনি, লিভার ও হৃদ্যন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ অথবা ক্যানসারের মত দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের জন্য এ ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ দীর্ঘদিন নিয়মিত ওষুধ সেবন করার কারণে ওষুধের গুণগত মানের ওপর তাদের চিকিৎসার সাফল্য নির্ভর করে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল ও ভেজাল ওষুধের বিস্তার শুধু একটি বাণিজ্যিক অপরাধ নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ঔষধ প্রশাসন, চিকিৎসক, ফার্মেসি মালিক এবং ভোক্তা সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন