প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
শতবর্ষের পুরনো আলোকচিত্র, স্থাপত্যের নকশা এবং দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছেন জর্দানের ইতিহাসবিদ ও স্থপতি মুহাম্মদ হাশেম ঘুশা। তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সংগ্রহের ফলস্বরূপ তৈরি পাঁচ খণ্ডের ‘জেরুজালেমের স্মৃতি’ বা ‘জাকিরাতুল কুদস’ সংকলনে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ফিলিস্তিনের স্থাপত্য, সামাজিক জীবন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংকলনটিতে উসমানীয় শাসনামল, ব্রিটিশ ম্যান্ডেট, জর্ডানের শাসনকাল এবং ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও জীবনযাত্রার চিত্র স্থান পেয়েছে। ঘুশার দীর্ঘদিনের গবেষণা ও নথি সংগ্রহের মাধ্যমে তৈরি এসব ছবি সাধারণ পাঠক, গবেষক এবং ফিলিস্তিনের ইতিহাসে আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
আনাদোলু জানিয়েছে, সংস্থাটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে পাঁচ খণ্ডের মূল আরবি গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত ছবির সঙ্গে থাকা তথ্য অনুবাদ করেছে, যাতে জেরুজালেমের ইতিহাসের এসব দৃশ্যমান দলিল আরো বিস্তৃতভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছানো যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।
জেরুজালেমের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ঘুশা ২০২০ সালে সৌদি আরবের কিং ফয়সাল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর গবেষণার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিজের পরিবারের বাস্তুচ্যুতির ইতিহাসও।
১৯৪৮ সালের নাকবা বা বিপর্যয়ের পর অসংখ্য ফিলিস্তিনির মতো ঘুশার পরিবারও বাস্তুচ্যুত হয়। ১৯৫৪ সালে তাঁদের জেরুজালেম ছেড়ে যেতে হয় এবং পরে তাঁরা কুয়েতে বসতি স্থাপন করেন। ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করার পর পরিবারের পক্ষে শহরটিতে ফিরে আসা সম্ভব হয়নি।
ঘুশার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন দূরে থাকার সময় জেরুজালেমে ফিরতে না পারার বেদনা তাঁদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন শুধু আমাদের মাতৃভূমি ছিল না, এগুলো ছিল আমাদের অতীত, ভবিষ্যৎ ও হৃদয়।’ তাঁর দাবি, ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তাঁদের জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনে প্রত্যাবর্তন নিষিদ্ধ ছিল।
১৯৯৪ সালে ফিরে আসতে পারার পর ঘুশা তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। এরপর তিনি জেরুজালেমের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন অনুসন্ধান, মাঠপর্যায়ের গবেষণা এবং প্রাথমিক সূত্রের ভিত্তিতে শহরটির ইতিহাস নথিবদ্ধ করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
ঘুশার মতে, একজন ইতিহাসবিদের দায়িত্ব শুধু অতীতের ঘটনা লিপিবদ্ধ করায় সীমাবদ্ধ নয়; ঐতিহ্য ও সভ্যতার নিদর্শন সংরক্ষণ করে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। তিনি বলেন, ‘আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সভ্যতা নিয়ে লেখা চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, ঐতিহ্য ছাড়া আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ খুঁজে পাব না।’
প্রায় ৩০ বছরের গবেষণা ও পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতায় ঘুশা গাজা ও জেরুজালেমের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ও খ্রিষ্টীয় স্থাপনার ইতিহাস নথিবদ্ধ করেছেন। তিনি ফিলিস্তিনের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার সম্মুখভাগ, অভ্যন্তরীণ অংশ ও স্থাপত্যপরিকল্পনার নকশাও তৈরি করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব স্থাপনার বেশ কয়েকটি পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
গাজার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে তিনি আল-ওমারি গ্র্যান্ড মসজিদ ও মসজিদে সাইয়্যিদ হাশিমের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, স্থাপনাগুলো বর্তমানে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার মুখে রয়েছে। এ ছাড়া গাজার বিভিন্ন গির্জা, ইবনে মারওয়ান মসজিদসহ অন্যান্য মসজিদ, মাজার, ঐতিহাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রাচীন সরাইখানাও তাঁর গবেষণার আওতায় এসেছে।
ঘুশা মনে করেন, এসব স্থাপনার সঠিক স্থাপত্যগত জরিপ ও নথিপত্র তৈরি করা জরুরি। এর মাধ্যমে স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক পরিচয় সংরক্ষণ করা যাবে এবং ভবিষ্যতে পুনরুদ্ধার ও গবেষণার কাজে সহায়তা মিলবে।
ফিলিস্তিনের ইতিহাস অনুসন্ধানে আলোকচিত্রের গুরুত্বও বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন এই ইতিহাসবিদ। তাঁর মতে, পুরোনো ছবিতে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক রীতিনীতি, ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের পরিবর্তন সম্পর্কে এমন তথ্য পাওয়া যায়, যা শুধু লিখিত নথি থেকে জানা কঠিন। উনিশ শতক থেকে ফিলিস্তিন সফর করা পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের তোলা ছবি এখন দেশটির অতীত পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
এ ছাড়া গাজা নিয়ে আনাদোলুর প্রকাশিত ‘দ্য গাইড’, ‘দ্য উইটনেস’ ও ‘দ্য অ্যাকিউজড’ শিরোনামের তিনটি বইয়ের কথাও উল্লেখ করেন ঘুশা। তাঁর দাবি, এসব বইয়ে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় সংঘটিত অপরাধ ও ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ নথি সংকলিত হয়েছে।
ঘুশার দীর্ঘদিনের এই উদ্যোগে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও আলোকচিত্র সংরক্ষণ শুধু অতীতকে জানার বিষয় নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁর বিশ্বাস, ফিলিস্তিনিরা একদিন নিজ ভূমিতে ফিরে আসবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকা জরুরি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন