প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
পশ্চিমবঙ্গে অপহৃত হকার আকবর আলীকে নির্মমভাবে পিটিয়ে খুনের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে মানবাধিকার সংগঠন 'অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস' (এপিসিআর)।
এটি একটি করুণ ঘটনা, যা ২০ জুন ২০২৬-এর সন্ধ্যায় ০৭:৩৫ পিএম-এ প্রকাশিত হয়েছে।
পাওনা টাকা নিয়ে সামান্য বচসার এক পরিণতি হিসেবে এটি ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই ঘটনার স্থান পুরুলিয়া জেলার সুপোর্ডিহ গ্রাম। গত ৯ জুন ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বাঁকুড়া জেলার পুনিসোল গ্রামের ৪৫ বছর বয়সী হকার আকবর আলী মণ্ডল।
সম্প্রতি এপিসিআর-এর একটি প্রতিনিধি দল নিহতের পরিবার এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে একটি চাঞ্চল্যকর ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
এপিসিআর-এর পশ্চিমবঙ্গ শাখার প্রতিনিধি দল ১৭ জুন নিহতের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ৯ জুন পুরুলিয়ার সুপোর্ডিহ গ্রামে জিনিসপত্র বিক্রি করছিলেন আকবর আলী মণ্ডল। এই সময় অভিযুক্ত বিশ্বনাথ মাহাতো টাকা না দিয়েই জোরপূর্বক জিনিসপত্র নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আকবর আলী যখন তার প্রাপ্য টাকা দাবি করেন, তখন দুজনের মধ্যে তুমুল তর্কাতর্কির সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ করা হয়েছে, এরপর অভিযুক্ত বিশ্বনাথ একটি লাঠি নিয়ে এসে আকবর আলীর ওপর চড়াও হন এবং তাঁর মাথা ও মুখে আক্রমণ করতে শুরু করেন। গুরুতর আঘাতের ফলে ঘটনাস্থলেই আকবর আলীর মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর রিপোর্ট বলছে, অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার জন্য নিহতের মরদেহ একটি গোয়ালঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতের ছেলে জুলফিকার আলী মণ্ডল বাবার মরদেহ শনাক্ত করেন। জানা গেছে, ঘটনার সময় একটি প্রত্যক্ষদর্শীর মোবাইলে সমস্ত মারধরের ভিডিও রেকর্ড হয়েছে, যা বর্তমানে পুলিশের কাছে তদন্তের একটি প্রধান প্রমাণ হিসেবে রয়েছে।
আকবর আলী মণ্ডল ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, তিনি হকারি করে স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং এক ছেলের সংসার চালাতেন।
নিহতের স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রতিনিধি দলকে বলেন, "তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী ছিলেন, কখনো কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়াননি। তার কোনো শত্রু ছিল না।" আকবর আলীর ছেলে জুলফিকার বলেছেন, পুলিশ মারফত খবর পেয়ে তারা পুরুলিয়ায় আসেন। বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার এখন কঠিন আর্থিক সংকটে পড়েছে। সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের দৈনন্দিন টিকে থাকার বিষয় এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এপিসিআর-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং কাজ করা প্রান্তিক ও দরিদ্র হকারদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, "আকবর আলী মণ্ডলের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ট্রাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজে পিছিয়ে পড়া ও দুর্বল শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সুরক্ষার অভাব সনাক্ত করে।"
তদন্তকারী দল অনুসন্ধানকালে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বহিরাগত বিক্রেতাদের অনেকেই বিভিন্ন সময় সন্দেহ ও হয়রানির শিকার হন। কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম হকারদের প্রতি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও বাড়তি অবিশ্বাস লক্ষ্য করা যায় বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এই ঘটনায় আতঙ্কিত অনেক হকার দূরবর্তী এলাকায় ব্যবসা করা বন্ধ করে দিয়েছেন।
ঘটনার পর পুলিশ মূল অভিযুক্ত বিশ্বনাথ মাহাতোকে গ্রেফতার করেছে এবং মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ প্রশাসন নিহতের পরিবারকে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।
তবে এপিসিআর-এর রিপোর্টে কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই "পুঙ্খানুপুঙ্খ, নিরপেক্ষ এবং তথ্যপ্রমাণ-ভিত্তিক" তদন্তের জোর দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রমাণাদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে যে: নিহতের পরিবারকে অবিলম্বে সরকারি তহবিল থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক, সন্তানদের পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব প্রশাসনকে নিতে হবে এবং নিহতের বিধবা স্ত্রীকে পুনর্বাসন বা দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার সহায়তা দেওয়া হোক। এছাড়াও, প্রান্তিক ও পরিযায়ী হকারদের আইনি সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন