প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশ্বনেতাদের নেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য নতুন উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে বিভিন্ন দেশ এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। শুক্রবার অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সম্মেলন কপ-১৭ এর শেষ দিনের আলোচনায় এ পরিস্থিতি দেখা গেছে।
সংবাদ সংস্থা এএফপি’র প্রতিবেদনে জানা যায়, আর্মেনিয়ায় আয়োজিত এই সম্মেলনে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তবে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা আলোচনা ও দর-কষাকষির পরও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে।
সরকারি ভর্তুকি কীভাবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তা কমানো হবে, পৃথিবীর স্থলভাগ ও সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অর্থায়ন কীভাবে বৃদ্ধি করা হবে এবং জাতিসংঘের তহবিলশূন্য সংরক্ষণ তহবিলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবদান কীভাবে বাড়ানো যাবে—এসব বিষয়ে দেশগুলো এখনো একমত হতে পারেনি।
এছাড়া, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশ্বব্যাপী নেওয়া অঙ্গীকারগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য বহুল প্রতীক্ষিত প্রতিবেদন নিয়েও কোনো সমঝোতা হয়নি। শুক্রবারের আগেই এটি অনুমোদিত হবে বলে আশা করা হয়েছিল।
১৯ অক্টোবর আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দূর করে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। তবে অগ্রগতি হয়েছে ধীরগতিতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বড় কোনো অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি।
গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি আইরিন ওয়াবিউয়া বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, "আলোচনা থেকে আমাদের সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকারগুলো বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো তা দেখা যাচ্ছে না।"
ইয়েরেভানে সম্মেলনের শেষ দিন জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক প্রধান অ্যাস্ট্রিড শুমাখার বলেন, দেশগুলোকে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাতে সাহসী ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিতে হবে। জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের নির্বাহী সচিব শুমাখার বলেন, "আমাদের সামনে থাকা সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা শেষ করতে এখন ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে।"
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে
২০২২ সালে বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ প্রকৃতির অবক্ষয় ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস বন্ধ এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে ঐতিহাসিক অঙ্গীকার করেছিল। ওই চুক্তিকে ‘প্রকৃতির জন্য প্যারিস চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
এই চুক্তির আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ২৩টি বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্তত ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ, পরিবেশদূষণ ও ক্ষতিকর আগ্রাসী প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার।
তবে দ্বিবার্ষিক এ সম্মেলনের আগে জাতিসংঘের এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, নির্ধারিত প্রায় সব লক্ষ্য অর্জনের জন্য বর্তমান উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।
এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘বৈশ্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা’। এর মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রণয়ন এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা নেওয়ার কথা।
কিন্তু কয়েক দিনের দীর্ঘ আলোচনা ও দর-কষাকষির পরও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা ফনা অ্যান্ড ফ্লোরার প্রতিনিধি ক্যাথরিন ওয়েলার বলেন, "আমাদের গ্রহের মূল্যবান জীববৈচিত্র্য যখন চারদিক থেকে ক্রমাগত ধ্বংসের মুখে পড়ছে, তখন এই সুযোগকে কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না।"
বিশ্বজুড়ে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রমে অর্থ জোগানোর নতুন উৎস খুঁজে বের করাও সম্মেলনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি বাজেটের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় বিষয়টি নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ আরও জটিল হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চীনসহ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী উদীয়মান দেশগুলোকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অর্থায়নে যুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ নিয়ে আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় পড়েছে।
এ ছাড়া ‘ক্যালি ফান্ড’ নামে জাতিসংঘের একটি তহবিলকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগও বাধার মুখে পড়েছে। উদ্ভিদ ও অন্যান্য জীবের জিনগত তথ্য ব্যবহার করে মুনাফা অর্জনকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে এই তহবিল গঠন করা হয়েছে।
২০২৫ সালের শুরুতে চালু হওয়া এ তহবিলের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য বছরে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এতে জমা পড়েছে মাত্র প্রায় ১০ হাজার ডলার।
এর আগে ২০২৪ সালে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জীববৈচিত্র্য সম্মেলনেও সংরক্ষণ কার্যক্রমে অর্থায়ন নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘ দর-কষাকষি হয়। নির্ধারিত সময়ের পরও আলোচনা চললেও কোনো চুক্তি ছাড়াই সম্মেলন শেষ হয়। পরে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে রোমে পুনরায় আলোচনা শুরু হলে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।
এদিকে শুক্রবারের সম্মেলনে ২০২৮ সালে পরবর্তী জীববৈচিত্র্য সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে পানামা নাকি ইকুয়েডরকে নির্বাচন করা হবে, সে সিদ্ধান্তও নেওয়ার কথা রয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন