প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাতীয় সংসদকে জনগণের সমস্যা সমাধানের প্রধান কার্যকর ফোরাম হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি এই আহ্বানটি জানিয়ে বলেছেন, সংসদ রাজনৈতিক সংঘাত বা ‘বিনোদনের’ স্থান নয়। বরং এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হতে হবে যেখানে জনগণের সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং তাদের সমাধানের দায়িত্বশীল আচরণ হবে।
আজ জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে বাজেট-পরবর্তী সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এই কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের স্বার্থে সরকার যে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগে বিরোধী দল সমর্থন দেবে।
অন্যদিকে, তিনি জনগণের অধিকার বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো পদক্ষেপের বিরোধিতা অব্যাহত রাখার কথা তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, 'আমরা এমন একটি দায়িত্বশীল সংসদ চাই, যেখানে জনগণের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে এবং তার সমাধান খুঁজে বের করা হবে। সংসদ যেন বিনোদনের জায়গা না হয়; এটি জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে।'
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিরোধী দলের উত্থাপিত বেশ কয়েকটি প্রস্তাব চূড়ান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তিনি অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার (কালো টাকা সাদা করার) প্রস্তাব প্রত্যাহারকে স্বাগত জানান এবং বলেন, এই বিষয়ে বিরোধী দল শুরু থেকেই দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিল।
এছাড়া, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর প্রস্তাবিত অগ্রিম কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে মনে করেন।
আমদানিকৃত সাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক কমাতে স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও) জারির সরকারি আশ্বাসকেও তিনি স্বাগত জানান। তিনি বলেন, সাইকেল শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, রপ্তানিতে ভূমিকা রাখে এবং মূলত নিম্নআয়ের মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে।
তবে, বিরোধী দলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। এর মধ্যে অন্যতম ছিল দেশের অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাব, যাতে আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন সহজ হয়, এবং অর্থবছরের শেষদিকে তড়িঘড়ি ব্যয়ের প্রবণতা কমে।
তিনি অভিযোগ করেন, উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসে সম্পন্ন হওয়ায় বর্ষাকালে অপচয়, অদক্ষতা ও সরকারি অর্থের অপব্যবহার ঘটে।
বিরোধীদলীয় নেতা বছরে শেষে সম্পূরক বাজেটের ওপর নির্ভর না করে প্রতি তিন থেকে চার মাস অন্তর বাজেট মূল্যায়নের প্রস্তাব দেন।
তিনি মনে করেন, এতে সংসদের তদারকি ও জবাবদিহিতা আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বড় বাজেট প্রণয়ন নয়; বরং তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করা।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, 'জাতীয় লক্ষ্য ও পরিকল্পনা থাকলে বড় বাজেট কোনো সমস্যা নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দুর্নীতি। এগুলো মোকাবিলা না করতে পারলে জনগণ বাজেটের প্রকৃত সুফল পাবে না।'
সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়েও তিনি বলেন, বিরোধী দল শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের আন্দোলন অব্যাহত রাখবে।
তিনি জানিয়েছেন, 'আমরা জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তা রক্ষা করব। আমাদের আন্দোলন হবে সুসংগঠিত, নিয়মতান্ত্রিক ও অহিংস।'
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দাবি করেন, 'কোনো সরকার একা স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারে না। সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।'
সংসদীয় কার্যক্রম প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিরোধী দলের সদস্যদের বিতর্কে আরও বেশি অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং কার্যপ্রণালীগত ভারসাম্যহীনতা দূর করতে হবে, যাতে সংসদীয় গণতন্ত্র অর্থবহ হয়।
তিনি সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন বরাদ্দে সমতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ সব নাগরিকের, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়।
ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনকালীন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তার দল শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা কিংবা সরকারি আবাসিক প্লট ব্যক্তিগত মালিকানার জন্য গ্রহণ করেনি। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি বাসভবনে অবস্থান করা স্থায়ী মালিকানার বিষয় নয়।
তিনি জুলাই গণ-আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে জুলাই জাদুঘর ও জুলাই ফাউন্ডেশনের জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় সমালোচনা করেন এবং দাবি করেন, তাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
প্রবাসী কর্মীদের বিষয়ে তিনি বিশেষ করে মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় কমানোর দাবি জানান এবং বিদেশগামী কর্মীদের শোষণকারী রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেছেন, 'প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সংসদের ভেতরে ও বাইরে আমরা সোচ্চার থাকব। দরিদ্র মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে আমরা কখনো নীরব থাকব না।'
ডা. শফিকুর রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পক্ষেও জোরালো সমর্থন জানিয়ে বলেন, তিস্তা অববাহিকার লাখো মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগে রয়েছে এবং তারা একটি স্থায়ী সমাধানের দাবিদার।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। একসঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, তার দল শান্তিপূর্ণ, দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি অব্যাহত রাখবে এবং সহিংসতা ও সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করবে।
তিনি বলেন, 'আমাদের রাজনীতি হবে যুক্তিনির্ভর, দায়িত্বশীল ও শান্তিপূর্ণ। গঠনমূলক রাজনীতির মাধ্যমে আমরা একটি গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।'
ডা. শফিকুর রহমান গণমাধ্যমকে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি রাষ্ট্রের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সাংবাদিকদের ন্যায়নিষ্ঠা, স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ওয়াচডগের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, গণমাধ্যম সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সরকার ও বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকা যথাযথভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরবে। এ সময় সংসদে বিরোধী দলের সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন