প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম মন্তব্য করেছেন যে, দেশের নষ্ট রাজনীতি কখনো বরেণ্য সাংবাদিক আতাউস সামাদকে স্পর্শ বা প্রভাবিত করতে পারেনি। তিনি উল্লেখ করেন, আতাউস সামাদ নিজেই সিদ্ধান্ত নিতেন কী করবেন। তাকে দিয়ে কিছু করানো সম্ভব ছিল না। যদিও তিনি দেখতে নরম-সরম মানুষ ছিলেন, কিন্তু তার স্বাধীনচেতা মনোভাব ছিল। নিজের বিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত থেকে তাকে সরানো সম্ভব ছিল না।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে আতাউস সামাদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে) আয়োজিত স্মরণসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুস সালাম আরও বলেন, বর্তমানে আমরা একটি নষ্ট রাজনীতির মধ্যে আছি। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার সময় থেকেই এই ক্ষেত্রে বিচ্যুতি ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করার কথা ছিল। কিন্তু সাংবাদিকরাও সেই রাজনীতির সংক্রামক ব্যাধিতে জড়িয়ে পড়েছেন। এর ফলে সমাজ ও গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশ আবার একটি গণতান্ত্রিক পথে হাঁটা শুরু করেছে। এ পথে কিছু ভুল-ত্রুটি থাকবে। তবে গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে হবে এবং সরকারের পরিবর্তন নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে, সে চেষ্টা করতে হবে।
আবদুস সালাম সাংবাদিকতা ও সমাজ গঠনে সংবাদ ও সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আতাউস সামাদের মতো মানুষ খুবই বিরল, কিন্তু সাংবাদিকতায় এ ধরনের মানুষের উপস্থিতি জরুরি। তিনি বলেন, মানুষের মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। সমাজের প্রয়োজনে কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ প্রকৌশলী, কেউ সাংবাদিক, আবার কেউ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। নিজের নির্ধারিত ক্ষেত্রের বাইরে গিয়ে কাজ করলে সমাজে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
তিনি সাংবাদিকদের রাজনীতিকে রাজনীতিবিদ ও মেধাবীদের হাতে ফিরিয়ে আনতে কাজ করার আহ্বান জানান। এ সময় রাজনীতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন ও আদর্শ অনুসরণের কথাও উল্লেখ করেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ বলেন, আতাউস সামাদের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সংবাদের তথ্যের নির্ভুলতা ও সত্যতা। এরশাদ সরকারের সময় বিসিআইসি ভবন পরিদর্শনে গিয়ে কর্মচারীদের এরশাদবিরোধী স্লোগানের খবর বিবিসিতে প্রচার করায় বাংলাদেশে বিবিসির কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে তিনি সত্যের পক্ষে অটল ছিলেন এবং ভুল স্বীকার করেননি।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান অবজারভারে থাকাকালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কভার করা, শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা গোপন চিরকুটে মাওলানা ভাসানীর কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ১৯৭০ সালের শেষ দিকে প্রেসক্লাব থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্লোগান নিয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে আতাউস সামাদ যুক্ত ছিলেন। বার্তা সংস্থা, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সাপ্তাহিকসহ সংবাদমাধ্যমের প্রায় সব শাখায় তিনি কাজ করেছেন। নীতিভিত্তিক ব্যক্তিত্বের কারণে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারাও তাকে সম্মান ও সমীহ করতেন।
বিএজের সভাপতি ও আমার দেশ-এর যুগ্ম সম্পাদক এম আবদুল্লাহ বলেন, আতাউস সামাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল। তিনি জুনিয়র সাংবাদিক ও সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আলোচনা করতেন। তার সঙ্গে দেখা হলে বয়সের ব্যবধান ঘুচে যেত। এভাবেই তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে মিশে কাজ করতেন এবং করাতেন।
আতাউস সামাদের ভাতিজা ও জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, আতাউস সামাদ শুধু একজন প্রখ্যাত সাংবাদিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, সাহসী ও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত মানুষ। কাজের প্রতি তার আন্তরিকতা ও সততা ছিল অকৃত্রিম। গভীর রাতে ফোন করলেও তাকে রিপোর্ট ও পত্রিকা তৈরিতে মগ্ন দেখা যেত। জ্যেষ্ঠ ও শিক্ষকদের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং সাহসিকতা তরুণ সাংবাদিকদের জন্য অনুকরণীয়।
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ও দ্য ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, নব্বইয়ের দশক-পরবর্তী দলীয় মেরুকরণের সময়ে আতাউস সামাদ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে স্বাধীন ও পেশাদারিত্বের এক বিরল প্রতীক ছিলেন। সরকারি প্লট বা আর্থিক সুবিধার মোহে পড়ে তিনি কখনো নিজের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেননি। তথ্যের নির্ভুলতা ও প্রত্যক্ষ সূত্রনির্ভরতা ছিল তার সাংবাদিকতার অন্যতম শক্তি।
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট খাইরুল আনোয়ার মুকুল বলেন, শিক্ষক হিসেবে এবং পরবর্তীতে আমার দেশ ও এনটিভিতে সম্পাদক হিসেবে আতাউস সামাদকে পাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল অনন্য। সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন নিখুঁত পারফেকশনিস্ট। ‘অজ্ঞাত সূত্র জানায়’ কিংবা ‘সংশ্লিষ্ট মহল’ বলে অনুমাননির্ভর প্রতিবেদন লেখা তিনি অপছন্দ করতেন। সুনির্দিষ্ট তথ্য, নাম ও দলিলের ভিত্তিতে নির্মোহ ভাষায় সংবাদ পরিবেশনের নির্দেশ দিতেন।
আমার দেশ-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী বলেন, আমার দেশকে একটি ব্র্যান্ড ও জনপ্রিয় পত্রিকায় পরিণত করতে আতাউস সামাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। আমৃত্যু তিনি আমার দেশের সঙ্গে থেকে পত্রিকাটিকে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে অবদান রেখেছেন। সাংবাদিকতা জীবনে তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে। শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকতার নির্ভুলতার নীতি মেনে চলেছেন, যা সবার জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।
টাইমস অব বাংলাদেশ-এর উপদেষ্টা সম্পাদক ইলিয়াস খান বলেন, আতাউস সামাদ ছিলেন পারফেকশনিস্ট। তিনি কাজে ফাঁকি ধরতে পারতেন এবং রিপোর্টের সূত্র স্পষ্ট রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দিতেন। শিক্ষক, সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে তিনি অনেককে শিখিয়েছেন। সাংবাদিকতায় তার মতো মানুষের প্রয়োজন রয়েছে।
স্মরণসভায় আরও বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস খান, বিশিষ্ট লেখক ও টকশো ব্যক্তিত্ব সাখাওয়াত হোসেন শায়ন্ত, ডিইউজের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, বিএফইউজের সহকারী মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, ডিইউজের সাবেক নেতা বেলায়েত হোসেন, আমিরুল ইসলাম অমর, বিটিভির সাংবাদিক মোরশের আলম প্রিন্সসহ অনেকে।
বিএজের সভাপতি এম আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বুরহান উদ্দিন ফয়সালের সঞ্চালনায় স্মরণসভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন