প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাংলাদেশের কৃষি ও পল্লিঋণ খাতে এক বছরে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বেড়ে গেছে। এ তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। খাত-সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন, কৃষিঋণে শ্রেণিকৃত ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ কমাতে ঋণ বিতরণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়, বরং আদায় কার্যক্রমকেও জোরদার করতে হবে।
কৃষকের প্রকৃত চাহিদা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে ঋণ বিতরণ করা এবং ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শ্রেণিকৃত ও মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণ দ্রুত বাড়ায় ঋণ বিতরণ ও আদায় ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া ঋণ গ্রহীতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সময়মতো কিস্তি আদায় এবং অনাদায়ী ঋণের কারণ চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ মাসে কৃষিঋণে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ১৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৪৯৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এই হিসাবে এক বছরে শ্রেণিকৃত ঋণ কমেছে ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
একই সময়ে কৃষিঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ অংশও কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৯৬৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৯৩৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এক বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ কমেছে ১ হাজার ২৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা বা ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
তবে সামগ্রিক খাতে ঋণ কমলেও ব্যাংকভেদে চিত্র ভিন্ন। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে শ্রেণিকৃত ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ২০২৫ সালের আগস্টে ছিল ৪৫৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এক বছরে এ ঋণ বেড়েছে ৯১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণও বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে এ পরিমাণ ছিল ৩৮৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এক বছর পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এতে এক বছরে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ বেড়েছে ১১৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
শুধু খেলাপি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ নয়, আদায়যোগ্য কৃষিঋণের পরিমাণও ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭০৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এক বছরে আদায়যোগ্য ঋণ বেড়েছে ৭৩ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর কৃষিঋণ আদায়ের পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে আদায় হয়েছিল ৮৯৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি ৫ লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে কৃষিঋণের শ্রেণিকৃত ঋণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ—দুটিই বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে এসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত কৃষিঋণ ছিল ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৬৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এক বছরে বেড়েছে ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণও বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে এর পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ২২৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪৬৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এক বছরে এ ঋণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে শ্রেণিকৃত কৃষিঋণ কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে এসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ১৩ হাজার ৪৯৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ১৬৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। এক বছরে কমেছে ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণও কমেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮৯২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ কম। বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতেও কৃষিঋণের শ্রেণিকৃত ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ কমেছে। এক বছরে শ্রেণিকৃত ঋণ ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে ৮০১ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় নেমেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ কমেছে ২৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০২৬ সালের আগস্টে এসব ব্যাংকের মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের আগস্ট—উভয় সময়েই শ্রেণিকৃত এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণের পরিমাণ শূন্য ছিল।
কৃষিঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো মোট ৭ হাজার ৪১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা কৃষিঋণ আদায় করেছে। আগের বছরের একই সময়ে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এক বছরে আদায় বেড়েছে ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ।
ব্যাংকের ধরন অনুযায়ী, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে কৃষিঋণ আদায় বেড়েছে ৩৯ দশমিক ১৯ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে বেড়েছে ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আদায় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বেড়েছে ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
তবে আদায় বাড়লেও আদায়যোগ্য কৃষিঋণের পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ব্যাংকগুলোর মোট আদায়যোগ্য কৃষিঋণ ছিল ৩০ হাজার ৭৭৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৭৩২ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এক বছরে আদায়যোগ্য ঋণ বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬ সালের আগস্টে ৫৮টি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ হয়েছে ৬ হাজার ৮৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে বিতরণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮২৬ কোটি ৩ লাখ টাকা। এক বছরে কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে ৪২ দশমিক ১০ শতাংশ।
একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট কৃষিঋণের স্থিতি বেড়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে কৃষিঋণের স্থিতি ছিল ৫৯ হাজার ৫৪১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৬২০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এক বছরে ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। আগস্ট পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ৬ হাজার ৮৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণে এগিয়ে রয়েছে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ২৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অর্জন ১২ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংকগুলোর ১২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ।
ব্যাংকগুলোর বাইরে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডকে (বিআরডিবি) অন্তর্ভুক্ত করে হিসাব করলে, ২০২৬ সালের আগস্টে কৃষিঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ হাজার ৬৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ২১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এ হিসাবে এক বছরে বিতরণ বেড়েছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দশ বছরের পরিসংখ্যানে কৃষিঋণের শ্রেণিকৃত অংশের বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শ্রেণিকৃত কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ২৪০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
একই সময়ে কৃষিঋণ বিতরণ বেড়ে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঋণ আদায়ের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৪৫ হাজার ৬২৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে, আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ১৯ হাজার ৮০৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
২০২৬ সালের আগস্টে কৃষিঋণের মোট শ্রেণিকৃত ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ আগের বছরের তুলনায় কমলেও ইসলামী ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণমানের অবনতি দেখা গেছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ও মেয়াদোত্তীর্ণ কৃষিঋণের দ্রুত বৃদ্ধি খাতটির ব্যাংকভিত্তিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তুলে ধরেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিঋণের ঝুঁকি কমাতে শুধু ঋণ বিতরণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়, বরং ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই, অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত তদারকিও জোরদার করতে হবে। কৃষির উৎপাদনব্যবস্থা, কৃষি উপকরণের সরবরাহ এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থায়ন না হলে ঋণ আদায়ে চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণে খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি কৃষি অর্থায়নের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন