প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার ফলে হতাহতের ঘটনায় আজ রাত ৩টা পর্যন্ত রিয়াদগামী সকল ফ্লাইট বাতিল করেছে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। গত তিন দিনে রিয়াদগামী প্রায় ১০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। সউদীগামী এবং সউদী থেকে দেশে ছুটিতে আসার জন্য হাজার হাজার যাত্রী চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর অনেকেই ফ্লাইট বাতিলের খবর পান। ফলে বিদেশে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বাড়তি যাতায়াত ও থাকা খাওয়ার খরচের চাপেও পড়েছেন তারা।
রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ঢাকায় হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা সউদীগামী হাজার হাজার কর্মী অনাহার ও অনিদ্রায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কেউ কেউ আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে বিকাশে টাকা এনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিমানবন্দরের আশপাশের হোটেলে উঠেছেন। অনেকের কাছে খাবারের টাকাও নেই। সউদীগামী আটকেপড়া এসব যাত্রীদের ফ্লাইট কবে নাগাদ চালু হবে তা’ কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। ফলে তারা চরম উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। বিভিন্ন এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকাস্থ সউদী দূতাবাস কর্তৃপক্ষ সউদীগামী আটকে পড়া যাত্রীদের কোনো খোঁজ খবরও নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠছে।
আমাদের উত্তরাস্থ সংবাদদাতা মাসুদ ভারভেজ হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জানান, নিরাপত্তাজনিত কারণে একের পর এক রিয়াদ, ঢাকা-দাম্মাম ফ্লাইট স্থগিত হওয়ায় বাড়ছে যাত্রীদের দুর্ভোগ।
আজ ঢাকা থেকে সউদী আরবের দাম্মামগামী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪৯ ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে সউদী আরব যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের যাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একের পর এক ফ্লাইট স্থগিতের কারণে যাত্রীদের যাতায়াত পরিকল্পনা, কর্মস্থলে যোগদান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রমে বিঘœ ঘটার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে সউদী আরবে কর্মরত প্রবাসীদের কাছে ফিরে যাওয়া, নতুন কর্মস্থলে যোগদান কিংবা জরুরি প্রয়োজনে যাত্রার পরিকল্পনা করা যাত্রীদের জন্য এ পরিস্থিতি বাড়তি ভোগান্তির কারণ হতে পারে।
এর আগে শনিবার মধ্যরাতে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া যায়। হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। হতাহতদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ মিসর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। হামলার পর বিমানবন্দরটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। সউদী আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় ঢাকায় আটকে পড়া হাজার হাজার যাত্রী বিপাকে পড়েছেন। শনিবার থেকে এসব যাত্রী অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে সময় পার করছেন। অনেকেই নির্ধারিত ফ্লাইটে সউদী যাওয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে বিমানবন্দরে এসেছেন। কিন্ত আসার পর থেকে অপেক্ষার সময় কাটাচ্ছেন। সঙ্গে আছে হতাশাও। কারণ অনেকেরই কর্মক্ষেত্রে যোগদান, ভিসার মেয়াদ, জরুরি কাজসহ নানা সমস্যা রয়েছে।
কিন্ত হঠাৎ করে রিয়াদ বিমানবন্দরে এমন হামলা শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমপক্ষে ফ্লাইট বাতিল করার খবর পাওয়া গেছে। এসব ফ্লাইটে প্রায় চার হাজার যাত্রীর সউদী আরবে যাওয়ার কথা ছিল। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সাউদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট।
বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, আকস্মিক ফ্লাইট বাতিল হওয়াতে নানা ধরনের সমস্যা ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যেমন ঢাকা থেকে কোনো যাত্রীরা সউদী যেতে পারছেন না ঠিক তেমনি সেখান থেকেও যাত্রীরা আসতেও পারছেন না। পরিস্থিতি কবে ঠিক হয়ে ফ্লাইট স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে তারা কিছু জানতে পারছেন না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিমানবন্দরে আসা অনেক যাত্রী ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। কবে ফ্লাইট চালু হবে, টিকিটের তারিখ কীভাবে পরিবর্তন করবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় তারা। সময়মতো কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে চাকরি হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি নতুন করে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেকে।
রিয়াদগামী যাত্রী শাহ আলম বলেন, রিয়াদে যাওয়ার জন্য টিকিট কেটে গত আগস্টে দেশে এসেছিলেন তিনি। রোববার দুপুরে তার ফ্লাইট ছিল। কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন। শাহ আলম বলেন, সউদী আরবে তার কাজ রয়েছে। সময়মতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে।
ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে তাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা যাত্রী হুমায়ুন আহমেদ অভিযোগ করেন, ফ্লাইট বাতিলের কারণে বিমানবন্দরে হাজার হাজার যাত্রী এখানে জড়ো হয়েছেন। একটা ঘিঞ্জি অবস্থা বিরাজ করছে। আসিফ আহমেদ নামের যাত্রী বলেন,
এয়ারলাইন্সগুলো ভালো কো-অপারেটিভ করছে না। কি করবো না করবো কিছু জানাচ্ছে না। এমনকি থাকার ব্যবস্থাও নাই। বিমানবন্দরে পোস্টার টাঙিয়ে ফ্লাইট বন্ধের কথা জানানো হয়েছে। ফ্লাইট চালু হলে টিকিট কার্যকর করা হবে বলে জানিয়ে পোস্টারে দেয়া নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। সিলেটের বাসিন্দা রিয়াদগামী যাত্রী সানোয়ার বলেন, রোববার আমার ফ্লাইট ছিল। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। কবে যেতে পারবো সেটা জানি না। সময়মতো না গেলে সমস্যায় পড়তে হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শরীফ উদ্দিন বলেন, সউদী যাওয়ার জন্য ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের টিকিট কেটেছিলাম। মুম্বই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্ত এখন আর হলো না। অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে সময় পার করছি। আজ সোমবার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদগামী যাত্রীদের উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কেউ টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছিলেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী করণীয় জানার চেষ্টা করছিলেন।
ফ্লাইট বাতিলের পর বিকল্প যাত্রার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় অনেকেই বুঝতে পারছিলেন না, কবে আবার সউদী আরবে যেতে পারবেন। আল আমিন নামের যাত্রী বলেন, মহাবিপদে পড়েছি। আমার মালিক কিছুদিন ধরে ফোন করছিল তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য। কিন্ত যাওয়া হলো না। আমার বাড়ি বরিশালে, অনেক দূর। গাড়িতে যাতায়াতেও অনেক খরচ। এখানে বসে থাকলে তো অনেক সমস্যা। নোয়াখালী থেকে আসা যাত্রী আজাদ রহমান বলেন, নোয়াখালী থেকে এসেছি। এখন আবার নোয়াখালীতে ফিরে যেতে হলে যাওয়া-আসায় প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা খরচ হবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে বিমানের অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ফ্লাইট চালু হলে যোগাযোগ করে টিকিটের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে নতুন টিকিটের জন্য টাকা লাগবে না বলেও জানানো হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এ বিষয়ে অবহিত করছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানাচ্ছি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সউদী আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সময়সীমা বাংলাদেশ সময় আজ সোমবার রাত ৩টা পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-রিয়াদ ও রিয়াদ-ঢাকা রুটের নির্ধারিত ইএ৩৩৯ ও ইএ৩৪০ ফ্লাইট দুটি স্থগিত করা হয়েছে। বিমানবন্দর জানিয়েছে, ফ্লাইট স্থগিতের কারণে যাত্রীদের সাময়িক অসুবিধার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আন্তরিকভাবে দুঃখিত। এদিকে, আকিদায়ে খতমে নবুওয়ত বাংলাদেশের আমীর ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা সাইফুল ইসলাম ফরিদী আজ সোমবার এক বিবৃতিতে রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথিদের হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, রিয়াদ বেসামরিক বিমানবন্দর ও জননিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলে হতিদের এমন যেকোনো হামলা আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক মূল্যবোধ এবং আঞ্চলিক শান্তির পরিপন্থী। এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিরীহ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাত নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন করতে হবে। প্রতিশোধ ও পাল্টাপাল্টি হামলার পথ পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বেসামরিক স্থাপনা, বিমান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
মাওলানা সাইফুল ইসলাম ফরিদী বলেন, মুসলিম বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংলাপের বিকল্প নেই। আমরা সব ধরনের সন্ত্রাস, সহিংসতা ও নিরীহ মানুষের ওপর হামলার নিন্দা জানাই এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন