প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রবিবার সকালে। ছদ্মবেশে ইলিশের ক্রেতা সেজে পটুয়াখালীর গলাচিপার চরবিশ্বাস ইউনিয়নের জেলে মন্নানের কাছে ফোন করা হয়। ইলিশের চাহিদা জানালে প্রথমে তিনি নাম ও পরিচয় জানতে চান। পরে, তিনি আসল ক্রেতা ভেবে ওই দিন দুপুর ২টার দিকে স্থানীয় চরআগস্তি বাজারে অপেক্ষা করতে বলেন।
একইভাবে, চরবিশ্বাস এলাকার বাসিন্দা মিজানের কাছে ফোন দিলে, তিনি সঠিক ক্রেতা কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কয়েক দফায় প্রশ্ন করেন। এরপর তিনি ইলিশের বিভিন্ন গ্রেডের দাম জানান। সে অনুযায়ী, এক কেজি ওজনের একটি ইলিশের দাম দেড় হাজার টাকা, এক কেজির নিচের ইলিশ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এরপর, ছোট মাছ বিক্রি করা হয় ৪০০ টাকা কেজি দরে। তবে, তিনি চাইলেই এসব মাছ সরাসরি হাতে দিতে অস্বীকার করেন। মিজান জানান, চরকাজল এলাকায় অবস্থিত তার ওয়ার্কশপে টাকা রেখে গেলে সেখানেই পৌঁছে দেওয়া হবে চাহিদা মতো ইলিশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ও রবিবার সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে উপজেলার অন্তত ১৮টি স্থানে ইলিশ বেচাকেনা চলছে। এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে দালাল ও ব্যবসায়ী।
গলাচিপার চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট, বড় শিবা; চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চর আগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট, চরবাংলা; রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী, পাতাবুনিয়া স্লুইস গেট; সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা, পানপট্টি লঞ্চঘাট, বোয়ালিয়া স্লুইস গেট, পক্ষিয়া স্লুইস গেট, লঞ্চঘাট, লোন্দা স্লুইস গেট, গলাচিপা-পাটুয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে এলাকার প্রভাবশালীদের পরিচালনায় ইলিশ ধরা ও বিক্রি করা হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এসব জায়গায় ফোন করলেই পাওয়া যাচ্ছে ইলিশ মাছ। তবে, তার আগে গ্রাহকের নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হয়েই ইলিশ মাছ দেওয়া হচ্ছে। এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চলছে ইলিশ শিকার।
স্থানীয়রা বলছেন, গলাচিপার প্রত্যন্ত এলাকায় অনেকটা প্রকাশ্যেই ইলিশ বেচাকেনা চলছে। মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নদী ও সাগরে মাছ শিকার করা হচ্ছে। প্রশাসন অভিযান চালালেও স্থানীয় জেলেদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে।
গলাচিপা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ দিনে গলাচিপায় ৩৪টি অভিযান পরিচালনা করে ২৮৫ মেট্রিক টন ইলিশ জব্দ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় এক লাখ ৫৭৫ মেট্রিক টন জাল জব্দ করা হয়, যার বাজারমূল্য ২৩ লাখ ৬২০ টাকা এবং ১২টি মামলায় ছয়জন জেলেকে সাজা ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মোবাইল ফোনে কল দিলে ইলিশ মিলবে ঠিকই, কিন্তু কোনো অপরিচিত ব্যক্তির কাছে মাছ বিক্রি করা হয় না। জেলেদের মধ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা সব বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণ করেন। নির্ধারিত ব্যক্তিকে ফোনে অর্ডার দিলেই ব্যাগে করে পৌঁছে যায় ইলিশ মাছ।
অভিযোগ রয়েছে, চরবিশ্বাসের প্রত্যন্ত এলাকা নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চলাকালে উল্টো প্রশাসনের ট্রলারকে ধাওয়া দেন সেখানকার জেলেরা। একদিকে অভিযান চলে, অন্যদিকে ইলিশ শিকার করেন তারা। দেদারসে শিকার ও বিক্রি করা হয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, গলাচিপা পৌর এলাকাসংলগ্ন রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দিরসংলগ্ন তেঁতুলিয়া পয়েন্ট, বন্যাতলীর তেঁতুলিয়া পয়েন্ট, পানপট্টি লঞ্চঘাট এলাকার আগুনমুখার মোহনায় জেলেরা প্রশাসনের নজর এড়াতে রাতের আঁধারে জাল ফেলছে। প্রশাসনের ট্রলার দেখামাত্রই তারা দ্রুত বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে গাঢাকা দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, অবৈধভাবে ইলিশ শিকার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পান না। এমনকি ইলিশ শিকারের পর নৌকা বা মাছের কাছে মোবাইল ফোন নিয়েও যাওয়া নিষেধ রয়েছে।
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, ‘আমরা মৎস্য অফিস ও সরকার ঘোষিত বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রেখেছি। প্রতিদিনই একাধিক অভিযান চলছে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় অনেক সময় সব জায়গায় দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব না হলেও সেখানে অভিযান চালানো হয়।
অভিযান পরিচালনাকারীদের ওপর জেলেদের হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘চরবিশ্বাস নোমোর স্লুইস এলাকা এমনিতেই দুর্গম। সেখানে আমাদের অভিযান চলাকালে ওই এলাকার সংঘবদ্ধ একটি চক্র আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা করে। পরে অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন