প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একসময় গান ছিল মোস্তফা বয়াতির পরিচয়ের মূল ভিত্তি, গান গেয়ে তিনি সংসার চালাতেন। মাটির সুরে পালাগান গেয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন এই বাউলশিল্পী। তাঁর স্বপ্ন ছিল গানকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু হৃদরোগের কারণে তাঁর কণ্ঠের স্বাভাবিক শক্তি হারিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে তিনি শেষ সম্বলটুকুও হারিয়েছেন। বর্তমানে নিজের চিকিৎসা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা এবং সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। জীবনের এমন কঠিন সময়ে তিনি সরকারের এবং সমাজের বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন।
শিল্পী মোস্তফা বয়াতি আচমিতা ইউনিয়নের গনেরগাঁও গ্রামের মেনু মিয়ার সন্তান। ১৯৯২ সালে ওস্তাদ লাল মিয়া বয়াতির হাত ধরে বাউল গানের জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সংগীতশিল্পী চূড়ান্ত নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হন মোস্তফা বয়াতি। এরপর তিনি পল্লীগানের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাউলগানের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল।
কিন্তু ২০০৯ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনের গল্প বদলে যায়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসক কর্নেল (অব.) জিহাদ খানের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, জোরে কথা বলা এবং গান গাওয়া নিষেধ। অথচ গান ছিল তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন, সেই গান থেকেই আজ দূরে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।
মোস্তফার ভিটেবাড়ি ছাড়া কোনো ফসলি জমি নেই। গান গেয়ে উপার্জিত অর্থের সঞ্চয় এবং সামান্য যে ফসলি জমি ছিল, তাও বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ মেটাচ্ছেন। এখন অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে তাঁর মানসিক রোগে আক্রান্ত বাবা দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে পারেন না। অসুস্থ মায়ের ওষুধের খরচ এবং সংসারের ব্যয় বহন করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
মোস্তফা বয়াতির ছাত্রীরা, লিজা বয়াতি, মৌ মিম বয়াতি, সাথী বয়াতি, ঐশী বয়াতি, সোনিয়া বয়াতি, মুন্না বয়াতি, ফারজানা বয়াতি, হ্যাপি বয়াতি ও আদরি সরকার জানান, তাঁরা মোস্তফা বয়াতির কাছ থেকে গান শিখছেন। মাঝে মাঝে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ পেলে সেখান থেকে পাওয়া পারিশ্রমিকের কিছু অংশ উস্তাদের চিকিৎসা ও ওষুধ কেনার জন্য দিয়ে থাকেন।
মোস্তফা বয়াতির স্ত্রী সেলিনা খাতুন জানান, তাঁর স্বামী গান গেয়ে সংসারের খরচ বহন করতেন। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তিনি গান গাইতে পারেন না। স্বামীর কষ্ট চোখের সামনে দেখেও কিছু করতে না পারার বেদনা তাঁকে প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খাচ্ছে। বর্তমানে মোস্তফা বাড়িতে কয়েকজন ছেলেমেয়েকে গান শেখান। সেখান থেকে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়েই কোনো রকমে দিন কাটছে পরিবারটির।
নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বাউলশিল্পী মোস্তফা বয়াতি বলেন, “২০০৯ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে আর আগের মতো গান গাইতে পারি না। আমার গাওয়া ৩৫টি অডিও ক্যাসেট বাজারজাত করেছি। গানই ছিল আমার একমাত্র সম্পদ ও জীবিকার অবলম্বন। আমার যা কিছু সঞ্চয় ছিল, সব চিকিৎসার পেছনে খরচ করেছি।
এখন মানসিক রোগে আক্রান্ত বাবা, অসুস্থ মা, স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছি। নিজের চিকিৎসা করাব, নাকি বাবা-মায়ের চিকিৎসা করাব, নাকি সংসার চালাব—কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। আমার চিকিৎসার জন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চাই।”
একসময় যে কণ্ঠে পল্লীগানের সুর ছড়িয়ে পড়ত মানুষের হৃদয়ে, আজ সেই কণ্ঠ একেবারেই নীরব। অভাব এবং অসুস্থতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন এই শিল্পী। সমাজের হৃদয়বান মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এগিয়ে আসেন, তবে হয়তো আবারও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন তিনি। স্বাভাবিক জীবনে বেঁচে থাকার স্বপ্ন ফিরে পেতে পারেন তিনি।
এমএইচ
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন