প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
২০২৪ সালের জুলাই গণআন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এ আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হয়েছিল এবং এতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ সময় ধরে কর্তৃত্ববাদী শাসন, বিরোধী মত দমন, নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। দীর্ঘ আন্দোলন, সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার অনুঘটক হিসেবে সরকারের পতন ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হয়।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতারা জানান, জুলাই আন্দোলনের রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহিতা, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এনসিপির জন্ম হয়। দলের আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব হিসেবে আখতার হোসেন এবং মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী একাধিক ছাত্রনেতা ও বিভিন্ন পেশাজীবীও দলটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
এনসিপি প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। রাষ্ট্র সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং নির্বাচনকে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার লক্ষ্য সামনে রেখে দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটে যোগ দেয় বলেছে দলটির নেতারা। জোটগত সমঝোতার ভিত্তিতে এনসিপি বিভিন্ন আসনে নির্বাচন করে এবং ৬টি আসনে বিজয় অর্জন করে, যা নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে গণ্য হয়।
এনসিপির সমর্থকদের দাবি অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সামনের সারির বহু সমন্বয়ক, ছাত্রনেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আন্দোলনকারী বর্তমানে এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত আছেন। তাদের মতে, জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক রূপই এনসিপি। ফলে জুলাই যোদ্ধা ও এনসিপিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তারা অভিযোগ করেন যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বার্থান্বেষী মহলের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জুলাই আন্দোলনের কর্মী এবং এনসিপির মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে আন্দোলনের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই আন্দোলন ছিল একটি সর্বস্তরের গণআন্দোলন। সেখানে নানা মতাদর্শের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তাই আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে কোনো একক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একীভূত করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের মতে, আন্দোলনের চেতনা জাতীয় সম্পদ এবং সেটি সব গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য প্রযোজ্য।
বিশ্ব রাজনীতিতেও গণআন্দোলনের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তির আত্মপ্রকাশের একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভারতে ২০১১ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পর ২০১২ সালে অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মনীশ সিসোদিয়া ও সঞ্জয় সিংয়ের নেতৃত্বে আম আদমি পার্টি (AAP) গঠিত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দিল্লিতে সরকার গঠন করে। পোল্যান্ডে ১৯৮০ সালের সলিডারিটি আন্দোলন কমিউনিস্ট শাসনের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দক্ষিণ আফ্রিকায় আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC) দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। তিউনিসিয়ার ২০১০-১১ সালের জেসমিন বিপ্লবও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করে এবং পরবর্তী সময়ে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাসে গণআন্দোলনের পর আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী অংশের রাজনৈতিক দল গঠন অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই দলকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সমালোচনা ও জনসমর্থনের পরীক্ষার মধ্য দিয়েই টিকে থাকতে হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জুলাই আন্দোলন, এনসিপির ভূমিকা এবং আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী বহু ব্যক্তি বর্তমানে এনসিপির নেতৃত্ব ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তবে আন্দোলনের সকল অংশগ্রহণকারী যে এনসিপির সঙ্গে একমত বা সম্পৃক্ত, এমন দাবি সর্বজনস্বীকৃত নয়; এ বিষয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক মত ও বিশ্লেষণও বিদ্যমান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন