প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুড়িগ্রাম জেলার ৪০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত তিস্তা নদীতে কোনো মাছের অভয়াশ্রম নেই। এর পাশাপাশি কারেন্ট শক এবং চায়না দুয়ারি জালের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ শিকার চলছে। এই কারণে অনেক দেশি মাছের প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে।
জেলেদের মতে, গত দুই দশকের মধ্যে তিস্তায় অন্তত ১০ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে চার-পাঁচটি প্রজাতির মাছ পাওয়া যাচ্ছে, যা খুবই সামান্য। নদীর বিখ্যাত বৈরালী মাছও এখন দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। সারা রাত জাল টেনে কখনো কখনো ১০০ টাকার মাছও মিলছে না। ফলে তিস্তানির্ভর জেলেদের জীবনযাত্রা চরম সংকটে রয়েছে। তারা ধার-দেনা এবং দাদনের ফাঁদে পড়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
সরেজমিনে বিদ্যানন্দ গ্রামের জেলে পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, জেলেদের জীবনের নানা সংকট। অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করলেও তিস্তাপারের ১০ গ্রামের মধ্যে একমাত্র এই জেলে পল্লীটি টিকে রয়েছে। এখানে অর্ধশত জেলে পরিবারের বাস, তবে অন্তত ২০টি পরিবার অন্যের জমিতে বসবাস করছে।
তিস্তার ভাঙনে সাতবার ভিটেমাটি হারিয়ে বর্তমানে বিদ্যানন্দ জেলেপাড়ায় বসবাস করছেন ষাটোর্ধ অতুল চন্দ্র দাস। তিনি নদীর কিনার ঘেঁষে ঘর বেঁধেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা রাজেন চন্দ্রের দেওয়া জমিতে তার জীর্ণ চালাঘর। তিন পুরুষের পেশা মাছধরা। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার বুকে জাল টেনে কাটিয়েছেন জীবন। এখন বয়সজনিত ক্লান্তি তার শরীরে। মাঝে মাঝে দুই ছেলের সঙ্গে জাল ও নৌকা নিয়ে তিস্তার টানে ছুটে যান।
ছেলে সবুজ দাস ও রঞ্জিত দাস রাতভর তিস্তার বুকে ভেসে বেড়ান, কিন্তু মাছের অভাবে তাদের পেশা হুমকির মুখে। তারা জানান, কোনো কোনো দিন এক কেজির বেশি মাছ পাওয়া যায় না। তাই কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত আধপেটা খেয়ে কাটাতে হয়।
সবুজ ও রঞ্জিত আরও জানায়, প্রতি হাজারে মাসে ১০০ টাকা সুদ দেওয়ার চুক্তিতে ১০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে নৌকা মেরামত করেছেন, কিন্তু নদীতে মাছের অভাবে সুদ ও আসল পরিশোধে উদ্বেগ বাড়ছে।
সবুজ চন্দ্র দাসের স্ত্রী সাধনা দাস জানান, তাদের আয় কমে গেছে। দুই সন্তানের লেখাপড়া ও চিকিৎসার জন্য মহাজনের কাছে ২০ হাজার টাকা দাদন নিয়েছেন, কিন্তু চার কিস্তি পরিশোধ করতে পারেননি। পূজার সময় আরও ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এইসব ঋণ এখন গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘এলা তিস্তার ওপরা ভরসা করি হামার জীবন চলে না।’
প্রতিবেশী সন্দেশ দাস ৯০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে এবছর নৌকা মেরামত ও নতুন জাল কিনেছেন, কিন্তু নদীতে মাছ না থাকায় টাকা শোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খাবারের সংস্থান ছাড়াও প্রতিবছর নৌকা মেরামত ও জাল কেনার জন্য মোটা অংকের টাকা খরচ হয়। ফলে জেলে পরিবারের দায়-দেনা বেড়ে যাচ্ছে।
সন্দেশের স্ত্রী মুক্তা রানী দাস বলেন, ‘নদীতে তো মাছ নাই, প্যাট তো সেটা মানে না। সুদের টাকা কেমন করি শোধ করমো, সেই চিন্তায় নিন্দ আইসে না।’
জেলেরা জানান, বছর দশেক আগে তিস্তায় রুই, কাতলা, আইর, বোয়াল, চিতল, চেলা, বৈরালী, উপুর চৌকা, ঢুরুয়া, বাইম, শোল, পুঁটি, টেংরা, ঘারুয়া, বাছা, চিংড়ি ও ইলিশসহ নানা প্রজাতির প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। ২০২২ সালের হরকা বানের ঘোলা পানিতে অনেক মাছ মরে যায়। এরপর মাছের উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও গত দুই বছর ধরে মাছের আকাল চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে অল্প পরিমাণে বৈরালী, চেলা, পুঁটি, টেংরা ছাড়া অন্য কোনো মাছের দেখা মেলে না।
বাহাদুর দাস নামের আরেক জেলে জানান, দুপুর ২টার পর জাল-নৌকা নিয়ে তিস্তায় নামেন তিনি। সারা রাত নদীতে মাছ ধরে সকালে ফেরেন, কিন্তু সুবিধা হয় না। মাছ বিক্রি করে এমন দিনও যায় যখন ১০০ টাকার বেশি আয় হয় না।
বৃদ্ধ জেলে বুদা দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, ১০-১২ প্রজাতির মাছ নদী থেকে হারিয়ে গেছে। আগে চেচা, ঘাইয়াল, ব্যার, মুঠা, আউংটা জালের ব্যবহার হতো; এখন ব্যার আর চেচা জাল ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। তিনি বলেন, ‘ওমারে প্যাট চলে না, মোক পোষে কেমন করি।’
জেলেদের অভিযোগ, চর এলাকায় অপেশাদার মাছ শিকারিরা ব্যাপকভাবে কারেন্ট জাল ব্যবহার করছে। এতে মাছের বংশ ধ্বংস হচ্ছে। জেলেরা এসব অমৎস্যজীবী ‘বাঙাল’ বা ‘ভাটিয়া’র ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। জীবন-জীবিকা হুমকিতে পড়লেও জেলেরা কখনো এসব নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করেন না। তাছাড়া জলভাগের একটা বড় অংশ ‘অমৎস্যজীবীরা’ দখল করে জেলেদের মাছ ধরতে বাধা দেয়। ফলে মাছ ধরার জায়গাও তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় আটটি মাছের অভয়াশ্রম রয়েছে। তবে এর মধ্যে একটি অভয়াশ্রমও তিস্তায় নেই। অথচ তিস্তা নদী ৪০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত। ব্রহ্মপুত্রে হাতিয়া ও শাখাহাতি ছাড়াও ছয়টি বিল ও ছড়ায় এই অভয়াশ্রমে দেশীয় মাছ সংরক্ষণ করে বংশ বিস্তারে সহায়তা করা হয়, কিন্তু তিস্তায় এ ধরনের কোনো মাছের অভয়াশ্রম নেই। তাই তিস্তায় বিচরণকারী মাছের প্রজাতি রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেই।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ জানান, দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষায় তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রকেন্দ্রিক একটি বড় আকারের অভয়াশ্রম গড়ে তোলার প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন