প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করলেও দলের নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দুঃশাসনের মধ্যে দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, মামলা, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা এবং সাংগঠনিক সংকটের পরিস্থিতিতে তিনি লন্ডন থেকে দলের পরিচালনার জন্য একটি ভার্চুয়াল কাঠামো গড়ে তোলেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকে, দেশে না থেকেও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দলীয় সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক কার্যক্রম, নির্বাচন প্রস্তুতি এবং আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শারীরিকভাবে দেশে না থেকেও কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে ভিডিও কনফারেন্স, স্কাইপ এবং অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি দলের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যুক্ত থাকতেন। ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার ঘটনা ছিল এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সে সময় তিনি লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৫৪০ জন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সাক্ষাৎকার নেন। এই ঘটনা নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় তাঁর সম্পৃক্ততা প্রদর্শন করেছে এবং দেশে না থেকেও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে তাঁর অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে। আওয়ামী লীগ তখন তাঁর এই ভূমিকা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগও করেছিল, কিন্তু কমিশনের তৎকালীন সচিব জানিয়েছিলেন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেওয়াকে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তারেক রহমান। ২০১৮ সালের পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক প্রশ্ন ছিল খালেদা জিয়া কারাগারে, তারেক রহমান লন্ডনে; তাহলে দলকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করবেন কে? বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা তখন বলেছিলেন, প্রযুক্তির যুগে শারীরিকভাবে দেশে উপস্থিত থাকা দল পরিচালনার প্রধান শর্ত নয়। তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই দল পরিচালনা করেন।
বাস্তবে, বর্তমান রাষ্ট্রপতি দলের তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা দেশের মাঠের রাজনীতি সামলালেও বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশল নির্ধারণে তারেক রহমানের ভূমিকা ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এর ফলে বিএনপির নেতৃত্বে একটি দ্বিস্তরীয় কাঠামো গড়ে ওঠে- দেশের ভিতরে মাঠের নেতৃত্ব এবং লন্ডন থেকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নির্দেশনা। শুধু কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নয়, দলের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসেও তারেক রহমান সক্রিয় ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন জেলা কমিটি গঠন এবং ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপিকে শুধু আন্দোলননির্ভর দল না রেখে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠনের চেষ্টা ছিল তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম দিক। পরবর্তী সময়ে সদস্য নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহের মতো কর্মসূচিতেও লন্ডন থেকে তিনি সরাসরি যুক্ত হন। এমনকি নিজের প্রাথমিক সদস্যপদও অনলাইনে নবায়ন করেন। এই কর্মসূচিতে তিনি দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ‘ভালো মানুষ’ ও মেধাবীদের সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দেন।
স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্বিষহ দমনপীড়নের সময়ে বিএনপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরি করা এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের সংগঠিত রাখা। লন্ডন থেকে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে তারেক রহমান নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি দলকে অটুটভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন, আন্দোলন ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে বিএনপির রাজনৈতিক বার্তাও তিনি নিয়মিত তুলে ধরেন। ২০২৪-পরবর্তী সময়েও লন্ডন থেকে বিএনপির বর্ধিত সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান অব্যাহত রাখেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি শুধু নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর দিকে নয়, সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেয়। বিভিন্ন জোটের কর্মসূচি ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিয়ে তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের বার্তা দেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এই দীর্ঘ অধ্যায়ের পর, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তারেক রহমান দেশে ফেরেন। এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের দায়িত্ব নেন। ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে লন্ডন থেকে বিএনপি পরিচালনার অভিজ্ঞতা তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। শারীরিক অনুপস্থিতিকে প্রযুক্তিনির্ভর নেতৃত্বে রূপান্তর, কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে যোগাযোগ, দলীয় কমিটি পুনর্গঠন, নির্বাচনি প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক ঐক্য— এ কয়েকটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি দীর্ঘ সময় দলটির সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখার চেষ্টা করেছেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন