প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গ্রিসের ক্রিট দ্বীপ এবং মূল ভূখণ্ডে প্রবল বাতাসের মধ্যে দাবানল নেভাতে গিয়ে তিনজন দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
চলমান দাবানলের কারণে বুধবার ইউরোপজুড়ে দাবানলটি আরও ছড়িয়ে পড়েছে। আগে স্পেন ও ফ্রান্সে ভয়াবহ আগুন জ্বলছিল টানা কয়েক দিন।
গ্রিসের দমকল বিভাগের একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, ক্রিট দ্বীপের ক্রিয়া ভ্রিসি গ্রামের কাছে আগুনের দুটি অংশের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় দুই দমকলকর্মী আগুনে আটকা পড়েন। অন্য একজন দমকলকর্মী পেলোপনেস অঞ্চলের আলাদা একটি দাবানলে মারা যান। স্থানীয় বাসিন্দারা ফোনে রয়টার্সকে জানান, প্রবল বাতাসের কারণে জনপ্রিয় অবকাশযাপন এলাকার কাছাকাছি আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এ কারণে ক্রিয়া ভ্রিসি এবং আশপাশের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দা ও পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ক্রিসা জিউকাকি বলেন, 'বাতাস এতটাই ভয়ংকর যে অনেক সময় দাঁড়িয়েও থাকা যায় না। আগুনের শিখা ছিল বিশাল। সত্যিই খুব ভয় লাগছিল।'
আগুন দক্ষিণ-পূর্ব দিকে উপকূলীয় শহর আগিয়া গালিনির দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ছোট একটি বন্দরের ওপরে পাহাড়জুড়ে সেখানে অনেক হোটেল রয়েছে। গালিনি মারে হোটেলের মালিক হারালামপোস সেভাস বলেন, বুধবার বিকেলে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িতে করে পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর আগে বুধবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের জরুরি সাড়া কেন্দ্রের প্রধান বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে গ্রিস ও ইতালিতে দাবানলের ঝুঁকি আরো বেড়ে যেতে পারে। ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ।
মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন আরো তীব্র হচ্ছে। তাতে তাপপ্রবাহ ও খরা বাড়ছে। এসব কারণে দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। গত কয়েক দিন ধরে স্পেন ও ফ্রান্সে দাবানলের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। আগুনে বিস্তীর্ণ বনভূমি পুড়ে গেছে। বহু বন্যপ্রাণীও মারা গেছে। স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা সতর্ক করে জানান, সামনে 'তিনটি কঠিন দিন' অপেক্ষা করছে। প্রবল বাতাস ও উচ্চ তাপমাত্রা থাকবে। তবে আভিলা ও মাদ্রিদ অঞ্চলের বড় দাবানল কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় কর্তৃপক্ষ কিছু এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ এবং ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ তুলে নিয়েছে।
অন্যদিকে কর্মকর্তারা স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জামোরা প্রদেশে নতুন একটি দাবানলের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ওই এলাকায় ছয়টি শহরের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রায় এক হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। স্পেনের আবহাওয়া সংস্থা জানায়, বুধবার অন্তত ছয়টি অঞ্চলের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এসব এলাকায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ফ্রান্সে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, যেখানে ভয়াবহ দাবানল চলছে, সেখানে তাপমাত্রা মঙ্গলবারের প্রায় ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। বিকেলের শুষ্ক বাতাস আগুন আরো ছড়িয়ে দিতে পারে। মঙ্গলবার রাতভর বোর্দোর পশ্চিমের বড় একটি দাবানল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হন ফরাসি দমকলকর্মীরা। বোর্দো বিমানবন্দরের কাছেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বিমানবন্দরটি খোলা ছিল। আবার ট্রাম চলাচল শুরু হয়েছে। হোটেলগুলোও খুলে দেওয়া হয়েছে।
তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, দাবানলের সংকট এখনও শেষ হয়নি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লেজ-ক্যাপ-ফেরে পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই এলাকায় কয়েকটি স্থানে আবার আগুন জ্বলে উঠেছে। তবে দমকলকর্মীরা সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছেন। সেখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের ল্য তঁপল এলাকায় আবার জ্বলে উঠা আগুন নেভাতে কাজ করছেন দমকলকর্মীরা। ট্রাক, পানির পাইপ এবং আকাশপথের সহায়তায় তারা গাছপালা ও বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। দমকল বাহিনীর কমান্ডার মাত্যু জোমাঁ দিনের শুরুতে সাংবাদিকদের বলেন, 'আজও আমরা পুরোপুরি সতর্ক আছি। কারণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী তাপমাত্রা আবার বাড়বে। বিকেলে বাতাসের গতিও আরো বেড়ে যাবে।' দাবানলে বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হয়েছে। পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় বোর্দোর পশ্চিমের লঁদ এলাকার দাবানলে মূলত পাইনগাছে ভরা প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হয়ে গেছে।
আগুন আটলান্টিক উপকূলের ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপের দিকে ছড়িয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে। এদের মধ্যে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা—দুই পক্ষই ছিলেন। ওই উপদ্বীপে যাওয়ার জন্য মাত্র একটি সড়ক রয়েছে। পরে প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে আবার বাড়িতে ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত ছোট সমুদ্রসৈকত শহর বিসকারোসে রাফায়েল ফোহানো তার মা-বাবার বাড়ির অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যান। ১৮ বছর বয়সী ফোহানো বলেন, 'এটা খুবই বড় ধাক্কা। ভাবতেই পারছি না, মাত্র এক ঘণ্টা আগেও আমি নিজের ঘরে ছিলাম। আর এখন সেখানে কিছুই অবশিষ্ট নেই।' তিনি জানান, তিনি যখন বাড়ির বাইরে ছিলেন, তখন তার বাবা-মা ও বোনকে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কিছু বজ্রঝড়, তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ার কারণে দাবানলের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। তবে দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঝুঁকি এখনও অনেক বেশি থাকবে। পুলিশ জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে ওই এলাকায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে খালি করে দেওয়া বাড়ি থেকে গয়না চুরির সন্দেহ রয়েছে। আরো দুজনের বিরুদ্ধে বোর্দোর একটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে খাবার চুরির অভিযোগ রয়েছে। আরেকজন নিজেকে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অর্থের বিনিময়ে পরামর্শ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। স্পেনে আভিলা ও মাদ্রিদ প্রদেশের পরিস্থিতির উন্নতি হলেও পূর্বাঞ্চলের কাস্তেইয়োনে বড় একটি দাবানল এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আগুনে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে আবারও আগুন জ্বলে উঠছে। কাস্তেইয়োনে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া প্রায় ১০ হাজার মানুষ এখনও নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেননি। তবে এর মধ্যে একটি আশার খবর এসেছে। কাস্তেইয়োন প্রদেশের লা ভিলাভেয়া এলাকায় বহু ঘোড়া রাখা একটি পশু চিকিৎসা হাসপাতাল আগুনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। স্থানীয় মানুষের চেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে। পশু চিকিৎসক অস্কার কেমাদেস বলেন, 'অলৌকিক ঘটনাও ঘটে। আমরা বেঁচে গেছি!'
বারবার এবং আরো তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অতিরিক্ত হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনও ব্যাহত হচ্ছে। সড়ক ও রেল চলাচলে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নদীপথে পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গ্রামাঞ্চল ও বন্য প্রাণীর ওপর দাবানলের ভয়াবহ প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্পেনের আভিলা প্রদেশের এল তিয়েম্বলো এলাকায় রয়টার্সের ড্রোনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ছাই হয়ে যাওয়া বনাঞ্চলের মধ্যে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া হরিণের দেহ পড়ে আছে। মাদ্রিদের বাসিন্দা সিন্তিয়া, যিনি শুধু নিজের নামই জানিয়েছেন, এল তিয়েম্বলোর সেই দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি এর আগে বহুবার ওই এলাকায় গিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাণীগুলোর জন্য খাবার নিয়ে আসতাম। আর আজ দেখুন, জায়গাটার কী অবস্থা।'
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন