প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কোন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে নাক গলানো বা মন্তব্য করা কোন একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। দীর্ঘদিন থেকে অভ্যাসবশত এমন মন্তব্য শুনে আসছে বাংলাদেশ। কিন্তু তা সীমালংঘন করে যেন কোন স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি সৌজন্যতা বোধ নষ্ট না করে সেদিকে খেয়াল রাখাও জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর নতুন একাডেমিগুলোর নাম ইসলামের চার খলিফা—হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.), হযরত ওসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.)—এর নামে রাখা নিয়ে ভারতের কিছু গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বা ইতিহাসের আলোকে কী নাম দেবে, সে বিষয়ে মন্তব্য করার নৈতিক বা কূটনৈতিক অধিকার অন্য কোনো রাষ্ট্রের কোথায়?
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সংবিধান, জনগণের ইচ্ছা এবং রাষ্ট্রের নিজস্ব নীতির ভিত্তিতেই এখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোনো সামরিক একাডেমির নাম কী হবে, কোথায় মসজিদ হবে, কোথায় মন্দির হবে কিংবা রাষ্ট্র কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলবে—এসব প্রশ্ন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ না করা। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা বারবার ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরেছে।
ভারত বহুদিন ধরেই "Neighbourhood First" নীতির কথা বলে আসছে। কিন্তু শুধু নীতির ঘোষণা দিলেই হয় না; প্রতিবেশীদের সঙ্গে আচরণেই সেই নীতির সত্যতা প্রমাণিত হয়। বাস্তবে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ কিংবা অন্যান্য প্রতিবেশী দেশকে ঘিরে যে বিতর্ক, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে—প্রতিবেশীদের প্রতি সম্মান দেখানো কি সত্যিই ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু?
একটি বড় রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সামরিক সক্ষমতা নয়; বরং আত্মবিশ্বাস, সংযম এবং প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জনের ক্ষমতা। ছোট রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া, তাদের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা প্রতিটি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা কখনোই আঞ্চলিক নেতৃত্বের পরিচয় হতে পারে না। বরং এসব আচরণ দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ায় এবং সহযোগিতার ভিত্তিকে দুর্বল করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের ইতিহাসে দুই দেশের সম্পর্ক যেমন বহু ইতিবাচক অধ্যায় দেখেছে, তেমনি সীমান্তে প্রাণহানি, নদীর পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য বৈষম্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মন্তব্যও দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির কারণ হয়েছে। এসব বাস্তবতা উপেক্ষা করে যদি আবারও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করা হয়, তাহলে তা বন্ধুত্বের বার্তা নয়; বরং সন্দেহ ও দূরত্বই বাড়াবে যা নতুন বহুমেরু ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, নিজস্ব কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত কিভাবে নেবে, নিজের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে কি পদক্ষেপ নেবে তা একান্তই একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের নেওয়ার অধিকার রয়েছে। আধুনিক বিশ্ব জঙ্গলের জংলি শাসনে চলেনা, মানব সভ্যতার ইতিহাস যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজেকে সে অনুযায়ী নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। কোন রাষ্ট্রে কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নামে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে কিংবা নিজের জাতীয় পরিচয় কীভাবে তুলে ধরবে—এসব নির্ধারণ করার একমাত্র অধিকার সেই স্বাধীন সার্বভৌমত্ব দেশের তথা বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের। এ সিদ্ধান্ত অন্য কারও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকে না। সে বিষয়ে মন্তব্য করাটাও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার পরিপন্থী।
আজকের বিশ্বে ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের লড়াইও তীব্র হচ্ছে। এমন সময়ে প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জন করা প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন। কারণ কোনো রাষ্ট্রই একা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না; আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির ভিত্তিতে।
ভারতেরও উচিত হবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ককে নির্দেশদাতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, সমমর্যাদার অংশীদারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা। বন্ধুত্ব চাপিয়ে দেওয়া যায় না; তা অর্জন করতে হয়। আর সেই অর্জনের প্রথম শর্ত হলো—প্রতিবেশীর স্বাধীন সিদ্ধান্তকে সম্মান করা এবং অযাচিত মন্তব্য ও হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা।
বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিচয়ে এগিয়ে যাবে। সেই পথের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণই। প্রতিবেশীরা যদি সত্যিকারের বন্ধুত্ব চায়, তবে তাদের উচিত হবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা, সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাকেই ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। কারণ আধিপত্য কখনো দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে না; সম্মানই পারে টেকসই সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণ করতে তা না হলে বর্তমান বহু মেরু বিশ্ব ব্যবস্থায় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত যদি পূর্বের মতো আধিপত্যবাদী ধ্যান ধারণা বজায় রেখে চলতে চায় তাহলে তার ভবিষ্যৎ কি তা ভবিষ্যত-ই নির্ধারণ করবে-এমন কথা বলা মনে হয় অমূলক হবে না।
লেখকঃ সাংবাদিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন