প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সরকার উৎখাতকে দেশের ‘প্রধান লক্ষ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও ইরানে সামরিক হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর সামর্থ্য ইসরাইলের রয়েছে, তবে দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কার্যকর কৌশল নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, বিমান হামলা চালিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য স্থল অভিযান প্রয়োজন হতে পারে, যা পরিচালনার জন্য ইসরাইলকে দীর্ঘ সময় ধরে বড় ধরনের সামরিক প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি থাকতেই জনমত জরিপে সমর্থন কমতে থাকা নেতানিয়াহু ইরানের সরকার উৎখাতের বিষয়ে এই অবস্থান প্রকাশ করেন। রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান পিট হেগসেথের ইসরাইল সফরের পর তিনি এ বক্তব্য দেন। তবে ইরানে নতুন হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেননি নেতানিয়াহু। ইরানের নেতৃত্বকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভিযানে ওয়াশিংটন যোগ দেবে, এমন নিশ্চয়তাও পাওয়া যায়নি।
আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান ইতোমধ্যে দুই দফা হামলা মোকাবিলা করেছে। দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতাও রয়েছে। ইসরাইলের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে, সেসব দেশও ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অন্যদিকে, নতুন সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সহায়তা করবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরানকে নিজেদের শর্ত মানতে বাধ্য করার বিশ্বাসযোগ্য পথ এখনো খুঁজে পায়নি ওয়াশিংটন। ফলে নতুন যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা।
ইসরাইলের সামরিক শক্তি কতটা কার্যকর
ইরানে হামলা চালানোর মতো সামরিক সক্ষমতা ইসরাইলের রয়েছে। যুক্তরাজ্যের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) গবেষক আরবান কনিংহাম আলজাজিরাকে জানান, ইসরাইলের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুত এবং আকাশে জ্বালানি নিয়ে দীর্ঘ সময় উড্ডয়নের সক্ষমতা দেশটিকে বাড়তি সুবিধা দেয়। তাঁর মতে, ইসরাইল আবারও আকাশপথে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারবে।
তবে সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা এবং একটি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা এক বিষয় নয়। বিশ্লেষকদের সংশয়, ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় আঘাত হানলেও দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরানোর মতো ফল অর্জন করতে পারবে কি না ইসরাইল।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় থেকেই নেতানিয়াহু ইরানের নেতৃত্বকে বড় হুমকি হিসেবে তুলে ধরছেন। ওই বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দেওয়া ভাষণে তিনি ইরানকে সবচেয়ে বিপজ্জনক শাসনব্যবস্থাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার অভিযোগ ছিল, দেশটিতে কঠোর স্বৈরশাসনের সঙ্গে উগ্র মতাদর্শের সমন্বয় ঘটেছে।
প্রায় তিন দশক পর নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের চাওয়া অনুযায়ী ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধে এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে ওয়াশিংটন অংশ নেয়। তবে এসব হামলার পরও ইরানের সরকার উৎখাত হয়নি।
বিমান হামলার সীমাবদ্ধতা নেতানিয়াহুও স্বীকার করেছিলেন। গত মার্চে তিনি বলেছিলেন, শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এর সঙ্গে স্থল অভিযানও প্রয়োজন। তবে সেই অভিযান কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
তুরস্কের কায়সেরি শহরের আবদুল্লাহ গুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জাগলার কুরচ আলজাজিরাকে বলেন, বিমান হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল করা সম্ভব। কিন্তু এতে দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হবে না। যেসব অস্ত্র ও সামরিক ব্যবস্থা গোপন বা সুরক্ষিত স্থানে রাখা হয়েছে, সেগুলোর অনেকই টিকে যেতে পারে।
কুরচের মতে, ইরানের সরকার উৎখাত করতে হলে স্থলসেনা মোতায়েনের পাশাপাশি বছরের পর বছর সেখানে অবস্থান করার প্রস্তুতি থাকতে হবে।
গোপন অভিযানেও সরকার উৎখাত কঠিন
ইরানে আগের হামলাগুলোতে ব্যবহৃত গোপন অভিযান ভবিষ্যতেও একইভাবে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কনিংহাম বলেন, গোয়েন্দা তৎপরতায় ব্যবহৃত নেটওয়ার্কগুলোকে তিনি ‘ব্যবহার করে বিসর্জন দেওয়ার মতো সম্পদ’ হিসেবে দেখেন। কারণ, এসব নেটওয়ার্ক কাজে লাগালে সেগুলোর পরিচয় ফাঁস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পরে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী সেগুলো শনাক্ত করে ভেঙে দিতে পারে।
তবে ইরানের ভেতরে ইসরাইলের মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এখনো রয়েছে বলে মনে করেন কনিংহাম। সাইবার হামলাও নতুন অভিযানের অংশ হতে পারে। কিন্তু এসব সক্ষমতা ব্যবহার করলে সেগুলোও প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে। তাই অভিযানে কতটা বাস্তব সামরিক সাফল্য পাওয়া যাবে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কনিংহামের মতে, গোপন অভিযান ও সাইবার হামলা দিয়ে ইরানের সরকার উৎখাতের সুস্পষ্ট পথ তৈরি করা সম্ভব নয়। কুর্দি বা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
মার্চে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সিএনএন কুর্দি ও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানায়। তবে সেই আলোচনা আর এগোয়নি।
কনিংহাম বলেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মোকাবিলা করার মতো সামরিক সক্ষমতা কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর নেই।
পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রেখেছে ইরান।
ইসরাইলের সমানসংখ্যক যুদ্ধবিমান না থাকলেও ইরান নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইসরাইলের জন্য সংঘাতকে ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য নির্ধারণব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ইরানের হাতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র এখনো থাকতে পারে।
আরইউএসআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল আলজাজিরাকে বলেন, ইরানের হাতে জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্য থাকতে পারে। এ ধরনের অস্ত্র তুলনামূলক সহজে তৈরি করা যায়। পুরোনো চীনা প্রযুক্তির জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশের উৎপাদন সক্ষমতাও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনেছে ইরান। এ ছাড়া দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা বিমান হামলা থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রক্ষার প্রাকৃতিক আশ্রয় হিসেবে কাজ করতে পারে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় ধরে হামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়তে পারে। কনিংহাম বলেন, আগের পাল্টাপাল্টি হামলায় ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অস্ত্রের মজুত কমেছে।
এ ধরনের সংঘাতের আর্থিক চাপও কম নয়। ইরানের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে ইসরাইলকে অনেক বেশি দামের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চললে ইসরাইলের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আরো কমতে পারে। অন্যদিকে, ইরান তুলনামূলক কম খরচে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র তৈরি করে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে।
নতুন হামলায় যুক্ত হবে কি যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। তাদের মতে, তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক স্বার্থে পার্থক্য রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন করে সংঘাত বাড়ানো এড়াতে ট্রাম্পের ওপর চাপ রয়েছে।
চলতি সপ্তাহে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে ইসরাইলের একটি প্রস্তাবে ট্রাম্প সম্মতি দেননি। তবে এতে এমন ইঙ্গিত নেই যে ওয়াশিংটন ভবিষ্যতের সব হামলার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। আপত্তিটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের সময় নিয়ে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইসরাইলের জন্য ইরানের গভীরে মাটির নিচে থাকা স্থাপনায় আঘাত হানা আরো কঠিন হবে বলে মনে করেন কনিংহাম। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা জিবিইউ-৫৭ বাংকার ধ্বংসকারী বোমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বোমার ওজন ৩০ হাজার পাউন্ড। ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমান ইরানের ফোরদো ও নাতাঞ্জের পারমাণবিক স্থাপনায় এসব বোমা ব্যবহার করেছিল। গভীর ভূগর্ভে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তৈরি এ অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা ইসরাইলের একার নেই।
কনিংহামের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া ইসরাইল হামলা চালালে ইরান পাল্টা আঘাতের মূল লক্ষ্য হিসেবে ইসরাইলকে বেছে নিতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন স্থাপনা এবং হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটানো এড়িয়ে চলতে পারে তেহরান। এর ফলে ওয়াশিংটনকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো ছাড়াই ইসরাইলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারে ইরান।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে। গাজায় গণহত্যার অভিযোগ ও সামরিক অভিযানের কারণে দেশটি আগে থেকেই ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে।
সামরিক সাফল্যই সরকার পতনের নিশ্চয়তা নয়
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে নতুন হামলার ক্ষেত্রে ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বাধা সামরিক শক্তির ঘাটতি নয়; বরং সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার বাস্তবসম্মত পথের অভাব। ইরানের সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হলেও তাতে দেশটির সরকার পতন নিশ্চিত হয় না।
কুরচ বলেন, কোনো সরকারকে উৎখাত করতে হলে সেখানে সেনা পাঠিয়ে কয়েক বছর অবস্থান করার প্রস্তুতি থাকতে হয়। ইসরাইলের পক্ষে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আর যুক্তরাষ্ট্রও এমন আরেকটি সরকার পরিবর্তনের অভিযানে জড়াবে না, যা বাস্তবায়নে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।
নেতানিয়াহু ইরানের সরকার উৎখাতকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করলেও সেই লক্ষ্য অর্জনের কার্যকর পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু স্থল অভিযান, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরানো কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
এএম
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন