প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—কোনো সাম্রাজ্য বাহ্যিক শক্তির চেয়ে বেশি ভেঙে পড়ে নিজের সীমাবদ্ধতার ভারে। রোম, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন—প্রতিটি পতনের শুরু হয়েছিল সেই মুহূর্তে, যখন তাদের অপরাজেয়তার মিথে প্রথম ফাটল দেখা দিয়েছিল।
প্রশ্ন উঠছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অনমনীয় প্রতিরোধ কি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব আধিপত্যের সেই ফাটলের আরেকটি অধ্যায়?
ইরানকে দ্রুত নতজানু করার যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবতা তার উল্টো চিত্র দেখিয়েছে। প্রবল সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও তেহরান আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয়নি; বরং প্রতিরোধের ভাষাকেই রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করেছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনা ও যুদ্ধসামগ্রীর প্রত্যাহারের খবর নতুন কৌশলগত প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। এটি কি কেবল সামরিক পুনর্বিন্যাস, প্রত্যাহার, নাকি দীর্ঘমেয়াদি ইরানি যুদ্ধাস্ত্রের ব্যাপক চাপে ক্ষয়ক্ষতির প্রতিফলন—সেই বিতর্ক চলতেই পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আজকের বিশ্ব আর একক শক্তির নির্দেশে পরিচালিত হয় না। বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ইরানের প্রতিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেদেরকে এখনও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি মনে করলেও তাদের নিজেদের সেনা কমান্ডারদের দেয়া তথ্যমতে, ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু করেই তাদের সব ধরনের অস্ত্রের মজুদ প্রায় শেষের পথে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব বড় বড় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও সেটি প্রচারিত হচ্ছে। তাই তার পতন এখন কি অনিবার্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বাস্তবসম্মত কিনা তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ আমাদের শেখায়, যখন কোনো পরাশক্তির প্রতিটি পদক্ষেপ আগের মতো অবাধ থাকে না, যখন প্রতিপক্ষ বারবার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, তখন আধিপত্যের ভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থা তেমনটাই নির্দেশ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তাই শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংঘর্ষ নয়; এটি বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্লিখনের সংগ্রাম।
যদি ইরান তার বর্তমান দৃঢ়তা, কৌশলগত ধৈর্য এবং প্রতিরোধের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, এবং নতজানু পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলী প্রস্তাবকে মেনে না নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক একমেরু বিশ্বব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে শুধু তাই নয় ভেঙে পড়তে পারে কয়েক দশকের বিশ্ব শাসন করা মার্কিন আধিপত্য।
আর যদি সেই চাপ ক্রমাগত বিস্তৃত হয়, তাহলে ভবিষ্যতের ইতিহাস হয়তো লিখবে—পারস্যের সিংহ খ্যাত ইরানের মত একটি দেশের অনমনীয় ও আপোসহীন মনোভাব ও প্রতিরোধেই বিশ্ব রাজনীতির দীর্ঘ কয়েক দশকের পরাশক্তির মানচিত্র বদলে দেওয়ার সূচনা করেছিল।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন