প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
তিনি বলেছেন, ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা পুরো জাতিকে শোকাহত করেছে। তবে শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আহতদের সাহস ও দৃঢ়তা থেকে নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা নিতে হবে।
সোমবার (২১ জুলাই) ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি আয়োজিত মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও স্মরণসভা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, প্রথমেই আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো আমাদের ভাই-বোন ও ছোট্ট বন্ধুদের। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
এ সময় তিনি নিহত শিক্ষার্থীদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, যাদের মধ্যে আরিয়ান, মরিয়ম, ওয়াকিয়া, রাইসা, মনিব, বোরহানউদ্দিন, বাপ্পি, শারিয়া আক্তার, নুসরাত জাহান আনিকা, সাইমা আক্তার, হুমায়ুন নূর, ফাতেমা, মোহাম্মদ জুনায়েদ হাসান, সাদ শাফিয়াউদ্দিন, তাসনিম আফরোজ, মাহিদ হাসান, আব্দুল্লাহ শামিম, তাহিয়া আশরাফ, নাজিয়া, মাহতাব রহমান, শায়ান ইউসুফ, তারিফ ফারহান, মোহাম্মদ আফনান ফয়াজ, শামিউল করিম, আব্দুল মুসাব্বির মাহমুদ, চান্দ মারমা, সাহিল ফারাবি, আরিয়ান মাহিয়া, তাসলিম, তাসনিয়া হক ও তানভীর আহমেদের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তিনি আরও স্মরণ করেন রজনী ইসলাম, লামিয়া আক্তার, আফসানা প্রিয়া, কো-অর্ডিনেটর মেহরিন চৌধুরী, সিনিয়র শিক্ষক মাসুকা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক মাহফুজা খাতুন এবং কর্মচারী মাসুমা বেগমকে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, আজ এমন একটি দিন, যেদিন পুরো দেশ ও জাতি গভীরভাবে শোকাহত। এই আকস্মিক ও ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি সমগ্র জাতি সমবেদনা জানাচ্ছে। আমি ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও আন্তরিক সমবেদনা জানাই।
আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও আপনারা যেভাবে সাহস ও সংকল্প নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তা জাতি কোনোদিন ভুলবে না। শোকের মধ্যেও আপনারা যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
তিনি বলেন, এই অভিজ্ঞতা আপনাদের জীবনের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় সাহস জোগাবে। অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে। আপনাদের মানবিকতা, সহমর্মিতা ও আত্মবিশ্বাস জাতির কাছে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির সময় উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা করেন ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসক, নার্স, স্বেচ্ছাসেবক, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), রহমান ফাউন্ডেশন এবং জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান।
একই সাথে যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও চিকিৎসক বিশেষজ্ঞদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, সংকটের সেই মুহূর্তে বহু মানুষ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবতার এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। সেদিন আমরা দেখেছি মানুষের জন্য মানুষ এখনও নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা একা নন। যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত আপনারা ওই কঠিন সময়ে অনুভব করেছেন, সেই হাত সবসময় আপনাদের পাশে থাকবে। দেশের মানুষ আপনাদের দুঃখ ভাগ করে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে।
বক্তব্য শেষে আহত এবং নিহত পরিবারের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুলে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি আমাদের ইতিহাসের অন্যতম একটি কালো অধ্যায়। সেদিন নিজের জীবনের পরোয়া না করে শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী যেভাবে আগুনে পোড়া বাচ্চাদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, আমি তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
তিনি আরও বলেন, সেই সংকটে সিঙ্গাপুর, ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশের চিকিৎসকেরা যেভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা আমাদের নতুন করে মানবিকতার শিক্ষা দেয়। আমাদের স্থানীয় চিকিৎসকেরাও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি আমাদের বার্ন ইউনিটের স্কিন ব্যাংক ও চিকিৎসকদের মানোন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেছে।
নিহত ও আহতদের পরিবারের আকুতির বিষয়ে আশ্বস্ত করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সম্মানিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান এখানে উপস্থিত আছেন। তিনি অবশ্যই আপনাদের বার্তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে পৌঁছে দেবেন। এছাড়া, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি নিজেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়ে আপনাদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার সব বার্তা সশরীরে পৌঁছে দেব।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি উন্নয়নশীল দেশের সরকারের পক্ষে এই বিপুল ব্যয় একাকী বহন করা কঠিন। তাই এর স্থায়ী সমাধানের জন্য আমাদের বার্ন প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত দেশগুলো সচেতনতার মাধ্যমে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।
নিহত মাইলস্টোনের কোর্ডিনেটর মাহেরিন চৌধুরীর স্বামী বলেন, মাইলস্টোনের ট্র্যাজেডির দায় কার আমার মনে হয় যারা ওইখানে কোমলমতি শিশুরা শিক্ষা নিতে গিয়েছিল এবং যেসব শিক্ষার্থী তাদের শেখাতে গিয়েছিল তাদের দায়। একটি বছর হয়ে গেছে, আমরা জানতেই পারলাম না এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে আসলে দায়ী কার ছিল। মেহেরিন জীবন দিয়ে তার কোমলমতি শিশুদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি। মাহেরিন চৌধুরী ছিলেন তারেক রহমানের চাচাতো বোন। আমরা বিষয়টি সবসময় চাপা রেখে চেয়েছিলাম কিন্তু বিষয়টি মিডিয়ার মাধ্যমে চলে এসেছে। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের আবেদন থাকবে, একটি বার হলেও জুবাইদা ম্যাডামকে বড় বোন হিসেবে দাবি থাকবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অন্তত নিহত এবং আহত পরিবার যাতে দুই ঘণ্টা আমাদের মনের দুঃখ কষ্ট শেয়ার করতে পারি। গত ইন্টারিম গভর্নমেন্ট আমাদের অনেক আশার ফুল জুরি দিয়েছিল কিন্তু সেটা আবার বাস্তবায়ন হয়নি।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিটে দগ্ধ হওয়া শিক্ষার্থীর আবিদুর রহমান আবিদ বলেন, আজকে সেই দিন যেদিন আমি টিফিন করার মুহূর্তে একটি বিমান আমাদের স্কুলের উপরে আছড়ে পড়েছিল। সে যে কী ভয়াবহ মুহূর্ত আমি হারিয়েছি আমার পূর্বের চেহারা চেয়ে অনেক খারাপ অবস্থায় আছে অনেকে। আর আমরা যাদেরকে হারিয়েছি, আমরা সেই সুখ কীভাবে সহ্য করবো।
ডা. জুবাইদা রহমানকে উদ্দেশ করে আবিদুর রহমান বলেন, আপনি এখানে এসেছেন, আমরা অনেক খুশি হয়েছি। আরো খুশি হতাম যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের সঙ্গে দেখা করতেন। আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। ডাক্তারদের চেষ্টায় ও আল্লাহর রহমতে এখন আমি অনেকটা সুস্থ। কিন্তু আমার বাম হাত এখনো পুরোপুরি ঠিক হয়নি। চিকিৎসক জানিয়েছেন আমার অপারেশনের প্রয়োজন। আশা করি তাদের চিকিৎসায় আমি সুস্থ হয়ে উঠবো। সেদিনের আর ভয়াবহ ছবি মনে করতে চাই না। আমরা তো আমাদের আর পূর্বের জীবন ফিরে পাবো না, তাই আমাদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন, এই আশা রাখি। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন এবং আমরা যাদের হারিয়েছি, তাদের মাগফেরাত কামনা করবেন।
স্মরণসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন– স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এবং ড্যাবের সভাপতি ডা. হারুনুর রশীদ, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং উপস্থাপনায় ছিলেন ডা. শাওন বিন রহমানসহ জাতীয় বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা।
অনুষ্ঠানে আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এসময় মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে সহায়তাকারী বেশ কিছু সংগঠন ও ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানের মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহতদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ সময় নিহতদের স্বজন, আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও উপস্থিত ছিলেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন